মেয়েদের মাঠে নামার সুযোগ নিশ্চিত করুন

সম্পাদকীয়

বেশ কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের নারী ফুটবলের সাফল্য আলোচিত একটি বিষয়। এরই ধারাবাহিকতায় জাতীয় পর্যায়ে মেয়েদের ফুটবল খেলতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে এবং তাঁদের অর্জন উদ্‌যাপন করা হচ্ছে। অথচ তৃণমূল পর্যায়ে কোনো কোনো গোষ্ঠীর আপত্তির মুখে সেই মেয়েদেরই মাঠে নামার সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে মেয়েদের প্রীতি ফুটবল ম্যাচ স্থগিত হওয়ার ঘটনা এই বাস্তবতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

 দিরাই উপজেলা স্টেডিয়ামে স্থানীয় স্বপ্নচূড়া স্পোর্টিং ক্লাব ও সিলেটের জারা স্পোর্টিং ক্লাবের মেয়েদের মধ্যে ম্যাচটি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মেয়েদের ফুটবল খেলাকে ‘অশ্লীলতা’ আখ্যা দিয়ে একটি পক্ষ তা বন্ধের দাবি জানায়। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, উপজেলা প্রশাসন দুই পক্ষকে সমঝোতা করতে বলে এবং পরে পুলিশের পক্ষ থেকে খেলা স্থগিতের পরামর্শ দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত খেলাটি অনুষ্ঠিত হয়নি।

এ ঘটনা নিছক একটি ম্যাচ বন্ধ হওয়ার বিষয় নয়, মেয়েরা প্রকাশ্যে খেলাধুলা করতে পারবেন কি না এবং সেটি অন্য কারও সম্মতির ওপর নির্ভর করবে কি না—এসব প্রশ্নও এখানে জড়িত। আপত্তিকারীরা নিজেদের খেলাধুলার বিরোধী নন বলে দাবি করলেও তাঁদের অবস্থানের প্রত্যক্ষ ফল হয়েছে মেয়েদের খেলার সুযোগ বন্ধ হওয়া।

দিরাইয়ে মেয়েদের ফুটবল খেলা নতুন নয়। স্বপ্নচূড়া ক্লাব ২০১৯ সাল থেকে স্থানীয় কিশোরীদের নিয়ে কাজ করছে। দেশের বিভিন্ন জেলার মেয়েদের দল সেখানে খেলেছে; স্বপ্নচূড়ার খেলোয়াড়েরা ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন। এমন একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হঠাৎ বাধার মুখে পড়লে শুধু নির্ধারিত ম্যাচ নয়, দীর্ঘদিনের প্রশিক্ষণ, সাংগঠনিক শ্রম এবং খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাসও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অভিভাবকদের মধ্যেও মেয়েদের মাঠে পাঠানো নিয়ে সংশয় তৈরি হতে পারে।

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও মেয়েদের ফুটবল আয়োজন বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। নির্বাচিত সরকারের আমলে এমন পরিস্থিতির অবসান হবে—এই প্রত্যাশা ছিল। দিরাইয়ের ঘটনা দেখাচ্ছে সরকার বদলালেও স্থানীয় পর্যায়ে মেয়েদের খেলাধুলার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত হয়নি।

এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বিরোধ দেখা দিলে আলোচনা প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু মেয়েদের ফুটবল খেলা নিয়ে আপত্তিকারীদের সঙ্গে সমঝোতার কথা বললে বাধাদানকারী পক্ষই কার্যত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা পায়। আয়োজকেরা নিজেরাই ম্যাচ স্থগিত করেছেন—এমন ব্যাখ্যাও যথেষ্ট নয়। কেননা এই সিদ্ধান্ত এসেছে চাপ ও নিরাপত্তাহীনতার পরিস্থিতি থেকে।

মেয়েদের মাঠে নামার সুযোগ নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। দিরাইয়ের মেয়েদের ফুটবল খেলায় বাধা সৃষ্টির পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা জরুরি। আমরা মনে করি, নিরাপদ পরিবেশে দ্রুত আবার ম্যাচটির আয়োজন করতে হবে এবং স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও ক্রীড়া কর্তৃপক্ষকে মেয়েদের খেলার পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে।