নারী শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তাহীন কেন

সম্পাদকীয়

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে দেশের অন্যতম আবাসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে প্রাণবন্ত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত। দুই যুগ আগে ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের পর এবং বিভিন্ন ঘটনায় নানা প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ পরিবেশ গড়ে ওঠে। কিন্তু সাম্প্রতিক দুটি ঘটনা সেই বিশ্বাসকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। একদিকে এক ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ, অন্যদিকে এক প্রাক্তন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে এক ছাত্রীকে বাসায় ডেকে নিয়ে নির্যাতন ও ধর্ষণ। এই দুই ঘটনা বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এগুলো আমাদের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ভয়াবহ সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে।

প্রথম ঘটনাটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সড়ক দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় এক ছাত্রীকে টেনেহিঁচড়ে ঝোপে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। এটি কোনো সাধারণ এলাকা নয়; এটি একটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, যেখানে শিক্ষার্থীরা দিনরাত চলাফেরা করেন। এমন একটি জায়গায় একজন নারী শিক্ষার্থী নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবেন না—এটি দুঃখজনক বিষয়।

ঘটনার পর সহস্রাধিক নারী শিক্ষার্থীর বিক্ষোভ মিছিল প্রমাণ করে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ কতটা তীব্র। ‘ক্যাম্পাসে ধর্ষণ করে, প্রক্টর কী করে’—স্লোগান নিছক আবেগ নয়; এটি প্রশাসনের প্রতি সরাসরি অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ। শিক্ষার্থীরা প্রক্টরের পদত্যাগ, কুইক রেসপন্স টিম গঠন, নারী নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগসহ যে দাবিগুলো তুলেছেন, সেগুলো কোনো অতিরঞ্জিত দাবি নয়; বরং একটি আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পূর্বশর্ত।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রায়ই বলে থাকে, তারা নিরাপত্তা জোরদার করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই নিরাপত্তা কোথায় ছিল, যখন একজন ছাত্রীকে রাস্তা থেকে টেনে নেওয়া হচ্ছিল? সিসিটিভি ফুটেজে সন্দেহভাজনের চেহারা পাওয়া গেলেও এখনো পরিচয় নিশ্চিত হয়নি—এটিও তদন্তের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর মামলা করা বা আশ্বাস দেওয়া যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ছিল এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে অপরাধী এমন দুঃসাহস দেখানোর সাহসই পেত না।

উদ্বেগের বিষয় হলো, ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার ঘটনায় এখনো আমাদের সমাজের একটি অংশ ভুক্তভোগীকেই দায়ী করার প্রবণতা দেখায়। কখনো প্রশ্ন ওঠে কেন রাতে বের হয়েছিল, কেন কারও বাসায় গিয়েছিল, কেন সম্পর্ক ছিল। অথচ এসব প্রশ্নের একটিও অপরাধীর দায় কমায় না। একজন নারী যেকোনো সময়, যেকোনো পোশাকে, যেকোনো স্থানে নিরাপদ থাকার অধিকার রাখেন। সম্মতি ছাড়া কোনো সম্পর্কই গ্রহণযোগ্য নয়—এটি সমাজকে স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে।

এই পরিস্থিতিতে শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিলেই চলবে না; প্রয়োজন একটি সমন্বিত সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কার্যকর যৌন হয়রানি প্রতিরোধ সেল সক্রিয় করতে হবে। ক্যাম্পাসে পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, নিয়মিত টহল এবং দ্রুত সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য ও আইনি সহায়তা সহজলভ্য করা জরুরি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, অপরাধীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা। আমাদের দেশে বহু যৌন সহিংসতার ঘটনা বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে হারিয়ে যায়। ফলে অপরাধীরা মনে করে, তারা পার পেয়ে যাবে। এই সংস্কৃতি ভাঙতে হবে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেবল পাঠদানের স্থান নয়; এটি একটি সভ্য সমাজের প্রতিচ্ছবি। যদি সেই জায়গাতেই নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তাহলে সমাজের সামগ্রিক অবস্থাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। জাহাঙ্গীরনগরের ঘটনাগুলো আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিল, ধর্ষণ কেবল একটি ফৌজদারি অপরাধ নয়; এটি ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ ও নারীবিদ্বেষের চরম প্রকাশ। এই বাস্তবতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্র, প্রশাসন ও সমাজকে একসঙ্গে রুখে দাঁড়াতে হবে।