নিরাপত্তা ও ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ নিরসন জরুরি 

সম্পাদকীয়

মুঠোফোন আমদানিতে কর ফাঁকি রোধ, অবৈধ ও নকল মুঠোফোনের প্রবাহ বন্ধ করা এবং এ-সংক্রান্ত অপরাধ দমনের লক্ষ্যে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিফিকেশন রেজিস্ট্রার (এনইআইআর) চালু করেছে সরকার। উদ্দেশ্যগুলো নীতিগতভাবে যৌক্তিক। কিন্তু এনইআইআর চালুর পর যে বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা কেবল একটি কারিগরি প্রশ্ন নয়; বরং রাষ্ট্রের ডিজিটাল নীতি নির্ধারণ ও প্রস্তুতির ঘাটতির প্রতিফলন।

এনইআইআর বাস্তবায়নের ধরন ও সময় নির্বাচন এই উদ্যোগকে শুরুতেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। এনইআইআর চালুর পর হঠাৎ করেই অনেক মানুষ দেখতে পেলেন তাঁদের জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে ৩০, ৪০ বা তারও বেশি মুঠোফোন নিবন্ধিত। সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অতীতে যেসব সিম দিয়ে যে হ্যান্ডসেটে সংযোগ ছিল, সেগুলোর আইএমইআই একত্রে দেখাচ্ছে। এই ব্যাখ্যা প্রযুক্তিগতভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে, কিন্তু নাগরিকের উদ্বেগ কাটাতে মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা, নাগরিকেরা মনে করছেন, তাঁদের এনআইডিতে নিবন্ধিত ফোন কোনো অপরাধে ব্যবহৃত হলে তাঁরা আইনি ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এত বড় একটি ব্যবস্থা চালুর আগে এসব বিষয় নিয়ে কেন নাগরিকদের কাছে স্পষ্ট করে জানানো হয়নি।

বাংলাদেশে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে অতীতের অভিজ্ঞতা এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দেয়। ২০১৬ সালে অপরাধ দমনের যুক্তিতে সিমের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই আঙুলের ছাপই অপব্যবহারের শিকার হয়েছে, যার ফলে প্রতারণা ও অপরাধের বহু ঘটনা ঘটেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নাগরিকদের সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এনইআইআরের মাধ্যমে সিম ও হ্যান্ডসেট উভয়ই যখন ব্যক্তির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, তখন এটি চালুর ক্ষেত্রে নজরদারি ও পরিচয় নিরাপত্তার ঝুঁকি কতটা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে?

এনইআইআর চালুর সময় প্রায় ১১ লাখ সিম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে এ ব্যবস্থা চালুর ক্ষেত্রে প্রস্তুতির ঘাটতি কতটা গভীর ছিল। পরে তা সমাধান করা হলেও, শুরুতেই এমন বিপর্যয় জন-আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিটিআরসি ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উচিত ছিল বিস্তারিত বিজ্ঞপ্তি ও সহজ ভাষায় ব্যাখ্যার মাধ্যমে মানুষকে আশ্বস্ত করা।

আমরা মনে করি, মুঠোফোন বাজারের বাস্তবতাও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। উচ্চ করহারের কারণে অবৈধ বা ‘গ্রে মার্কেট’ ফোনের দাপট বেড়েছে, যা দেশীয় সংযোজন ও উৎপাদনশিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে এনইআইআর কার্যকর হলে কর ফাঁকি কমানো এবং বৈধ শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া জরুরি। কিন্তু একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উদ্বেগকেও উপেক্ষা করার সুযোগ আছে বলে আমরা মনে করি না। সরকার হ্যান্ডসেট আমদানির ক্ষেত্রে শুল্কহার ৬১ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪৩ দশমিক ৪ শতাংশ করার ঘোষণা দিয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ কমেনি। মোবাইল হ্যান্ডসেটের দাম নিয়ে ভোক্তাদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আমরা মনে করি, মোবাইল হ্যান্ডসেটের দাম যাতে ভোক্তাদের নাগালের মধ্যে থাকে এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকা যাতে হুমকির মুখে না পড়ে, তার জন্য এ খাতে শুল্কহার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে।

আমরা মনে করি, এনইআইআর নিয়ে নাগরিক নিরাপত্তা সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। এটি যেন কোনোভাবেই নাগরিকের ওপর নজরদারির অস্ত্র না হয়ে ওঠে, সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। শুধু এনইআইআর নয়, যেকোনো নতুন ব্যবস্থা চালুর ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা গেলে ভালো উদ্যোগও ব্যাহত হতে পারে। ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের শঙ্কা ও উদ্বেগকে আমলে নেওয়া প্রয়োজন।