সরকারি প্রকল্পের সাফল্য শুধু কত টাকা খরচ হয়েছে, কত স্থাপনা নির্মিত হয়েছে বা কতজন সুবিধা পেয়েছেন, তা দিয়ে মাপা যায় না। প্রকৃত প্রশ্ন হলো জনগণের অর্থে করা প্রকল্প শেষ পর্যন্ত মানুষের কতটা কাজে লাগল। রাজশাহী বিভাগের ১০২টি পলিনেট হাউসের ক্ষেত্রে সেই প্রশ্নের উত্তর হতাশাজনক।
‘আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১০২টি পলিনেট হাউস নির্মাণে প্রায় ২৫ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটির পেছনে গড়ে খরচ ২৪ লাখ টাকা। তিন বছর পর দেখা যাচ্ছে, বেশির ভাগ হাউসে ফসল উৎপাদন হচ্ছে না। কোথাও পলিথিন ছিঁড়ে গেছে, কোথাও খুলে ফেলা হয়েছে, কোথাও যন্ত্রপাতি নষ্ট।
প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলা ১৬ কৃষকের ১০ জন বড় ধরনের লোকসানের কথা বলেছেন। সরেজমিনে দেখা সাতটি হাউসের চারটির পলিথিন ছেঁড়া এবং একটির পলিথিন পুরোপুরি খুলে ফেলা হয়েছে। প্রথম প্রশ্ন প্রকল্প পরিকল্পনা নিয়ে। গ্রীষ্মপ্রধান বাংলাদেশের আবহাওয়ায় পলিনেট হাউস কীভাবে কার্যকর হবে, ফসলভেদে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বায়ু চলাচল কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, এসব যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সফলতার জন্য এসব নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা প্রয়োজন। অথচ বিভিন্ন ফসলের জন্য প্রায় একই ধরনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রকল্পের নকশাতেই দুর্বলতা ছিল কি না, তা তদন্ত করা জরুরি।
নির্মাণের মান নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। কৃষকদের দাবি, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। অভিযোগ সত্য হলে ঠিকাদার, সরবরাহকারী ও তদারক কর্মকর্তাদের দায় নির্ধারণ করতে হবে।
প্রশিক্ষণ ও পরবর্তী কারিগরি সহায়তার ঘাটতিও স্পষ্ট। কৃষকেরা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ না পাওয়ার কথা বলেছেন। প্রকল্প পরিচালক আবার অভিযোগ করেছেন, কৃষকেরা পরামর্শ মানেন না ও পরিশ্রম করতে চান না। কিন্তু নতুন প্রযুক্তির প্রকল্পে শুধু নির্দেশিকা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যায় না; মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণ, ফসলভিত্তিক পরামর্শ, যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ ও নিয়মিত কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করতে হয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগ, ব্যর্থতা আড়াল করে কৃষকদের দিয়ে সাফল্যের গল্প বলানো হয়েছে। অথচ একজন কৃষক তিন বছরে ২৮ ধরনের ফসল ফলানোর চেষ্টা করে একটিতেও সফল হননি। কেউ কেউ অবশ্য চারা উৎপাদন, ফুল চাষ বা বিশেষ ধরনের চাষে সফল হয়েছেন। কিন্তু তাতে প্রকল্পের সামগ্রিক সাফল্য প্রমাণিত হয় না।
এখন দরকার স্বাধীন কারিগরি ও আর্থিক নিরীক্ষা। ১০২টি হাউসের নির্মাণসামগ্রীর মান, ব্যয়, দরপত্র ও ঠিকাদারি প্রক্রিয়া, নকশা, যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও ফলাফল খতিয়ে দেখতে হবে। অনিয়ম বা নিম্নমানের নির্মাণ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং প্রয়োজনে সরকারি অর্থের ক্ষতিও আদায় করতে হবে।