সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল দেশের বোরো উৎপাদনে বড় ভূমিকা রাখে। সেখানকার ফসল রক্ষা নিয়ে প্রতিবছর আলাদা বাঁধের প্রকল্প নেওয়া হয়, যে কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকেন কৃষকেরাও। এরপরও পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিরুদ্ধে বাঁধ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। শনিবার সুনামগঞ্জ শহরে কৃষক-জনতার গণসমাবেশ থেকে যে ১০ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছে, যা মাঠপর্যায়ে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রতীয়মান হয়।
সমাবেশ থেকে অভিযোগ উঠেছে, হাওর রক্ষা বাঁধে এখন আর ফসল রক্ষার উপায় নেই, বরং তা একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা ও সিন্ডিকেটের কাছে ‘লুটপাটের ব্যবসায়’ পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর হাওরে বোরো ফসলের সুরক্ষায় কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ বছরও ১২টি উপজেলায় ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১০টি প্রকল্পের মাধ্যমে ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে এই বিপুল ব্যয়ের কার্যকারিতা নিয়ে। কৃষকদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রয়োজনীয় ও অপরিকল্পিত বাঁধ দিয়ে হাওরের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে, যা জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে উল্টো ফসলেরই ক্ষতি করছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া এবং গণশুনানি না করে প্রাক্কলন তৈরি করার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা আমলাতান্ত্রিক স্বেচ্ছাচারিতারই নামান্তর।
সমাবেশে কৃষকদের পক্ষ থেকে যে ১০টি দাবি জানানো হয়েছে, তার প্রতিটিই অত্যন্ত যৌক্তিক। বিশেষ করে জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া, কৃষিঋণ মওকুফ এবং বাঁধ নির্মাণে অনিয়মের বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি এখন সময়ের দাবি। পানি উন্নয়ন বোর্ড কাবিটা নীতিমালা অনুযায়ী কাজ করার দাবি করলেও নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ না হওয়া এবং মাটির কাজে ব্যাপক দুর্নীতির যে অভিযোগ সাধারণ মানুষ তুলছে, তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
বাঁধের নামে মাটি লুট অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। হাওরের প্রাণ নদী ও খালগুলো খনন না করে কেবল প্রতিবছর মাটির বাঁধ দেওয়া কোনো টেকসই সমাধান হতে পারে না। ধোপাযান বা যাদুকাটার মতো নদীগুলো থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা এবং নদীগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনাই হওয়া উচিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওরে এ বছর প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। সপ্তাহখানেক পরই ধান কাটা শুরু হবে। এই মুহূর্তে কৃষকদের মনে প্রশান্তি থাকার কথা থাকলেও তাঁরা আছেন আতঙ্কে। বাঁধের স্থায়িত্ব এবং জলাবদ্ধতা নিয়ে তাঁদের এই দুশ্চিন্তা দূর করার দায়িত্ব সরকারের। আমরা আশা করব, সরকার কৃষকদের এ উদ্বেগ আমলে নেবে।