ভাঙন নিয়ে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই

সম্পাদকীয়

কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলায় অলওয়েদার সড়ক নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। এ সড়ক সেখানকার হাওর ও কৃষির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে আলোচনা রয়েছে। এর মধ্যে উপজেলার বাঙ্গালপাড়া ইউনিয়নে ধলেশ্বরী নদীর পাড় ঘেঁষে নির্মিত ‘অলওয়েদার সড়ক’ নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পথে। দেখা যাচ্ছে, যে সড়ক হাওর অঞ্চলের মানুষের যাতায়াতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের আশা জাগিয়েছিল, সেই ৪৪ কোটি টাকার প্রকল্প এখন কেবল অপরিকল্পিত উন্নয়নের একটি উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, গত এক সপ্তাহে অন্তত এক কিলোমিটার সড়ক ধলেশ্বরীর গর্ভে চলে গেছে। এতে বিদ্যুৎ–বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে দুটি গ্রাম। অনেক কৃষকের শত শত একর ফসলি জমি নদী কেড়ে নিয়েছে, নিঃস্ব হয়ে গ্রাম ছেড়েছেন অনেক বাসিন্দা। এ ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও জনগণের সেবা ও অবকাঠামো রক্ষার দায়িত্বে থাকা দুই কর্তৃপক্ষ পরস্পরকে দোষারোপ করে সময়ক্ষেপণ করছে। পাউবোর দাবি, এলজিইডি সড়ক নির্মাণের আগে প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণের পরামর্শ নেয়নি। অন্যদিকে এলজিইডি বলছে, ভাঙনের বিষয়টি কয়েক বছর ধরে চললেও পাউবো কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

প্রশ্ন জাগে, জনগণের করের টাকায় নির্মিত কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প কি তবে দাপ্তরিক সমন্বয়হীনতার বলি হবে? যদি এলজিইডি কোনো কারিগরি ভুল করে থাকে, তাহলে পাউবো দীর্ঘ কয়েক বছরে সেই ভাঙন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল কেন? হাওরবাসীর বিপদে পাশে না দাঁড়িয়ে এখন একে অপরকে চিঠি চালাচালি আর দোষারোপ করা মূলত দায়িত্বজ্ঞানহীনতারই নামান্তর।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ অত্যন্ত যৌক্তিক; এক-দুই বস্তা জিও ব্যাগ ফেলে এই প্রমত্ত নদীর ভাঙন ঠেকানো সম্ভব নয়। এখানে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা বাঁধ ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে নদীর গতিপথ নিয়ন্ত্রণ। অথচ সরকারের দুই বিভাগের রশি–টানাটানিতে সেই স্থায়ী উদ্যোগ থমকে আছে। ইতিমধ্যে ১৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে যে দীর্ঘ সেতুর নির্মাণকাজ চলছে, এ সংযোগ সড়ক না থাকলে সে বিশাল বিনিয়োগও অর্থহীন হয়ে পড়বে।

আমরা মনে করি, বর্তমান পরিস্থিতি কোনো একক দপ্তরের ব্যর্থতা খোঁজার সময় নয়, বরং সমন্বিতভাবে জনপদটিকে রক্ষার সময়। স্থানীয় সংসদ সদস্য ভাঙন রোধে স্থায়ী উদ্যোগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা ইতিবাচক। তবে সেই উদ্যোগ যেন কেবল ‘ফাইল চালাচালিতে’ সীমাবদ্ধ না থাকে।

এলজিইডি ও পাউবোকে দ্রুত একটি যৌথ কারিগরি দল গঠন করতে হবে এবং ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। যেসব কৃষক জমি হারিয়েছেন এবং যাঁরা গৃহহীন হয়েছেন, তাঁদের দ্রুত পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে। কেন নদী ঘেঁষে সড়ক নির্মাণের সময় প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা রাখা হলো না, তার তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।