সরকারকে সাহসী ও যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে

সম্পাদকীয়

দেশের অবকাঠামো পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে কাঠামোগত ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে দাঁড়ানো বিআরটি (র‍্যাপিড বাস ট্রানজিট) প্রকল্প নিয়ে সরকারকে অবশ্যই একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে। পরিকল্পনাহীনতা ও দায়হীনতার চূড়ান্ত নজির প্রকল্পটির জন্য দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে নাগরিকেরা যে সীমাহীন দুর্ভোগে আছেন, তার অবসান যত দ্রুত হবে, ততই মঙ্গলজনক। কেননা বারবার সময় ও ব্যয় বাড়ানোর পরও যানজট নিরসনের যে উদ্দেশ্য নিয়ে বিআরটি প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তা পূরণ হওয়ার নয়; বরং প্রকল্পটি চালু হলে উল্টো যানজট, জনভোগান্তি ও সরকারি ব্যয় বাড়তে পারে।

প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ি পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার সড়কের মাঝের দুই লেন আলাদা করে বিশেষ বাস চলাচলের জন্য ২০১২ সালে বিআরটি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল। ২০১৬ সালে নির্মাণকাজ শেষে পরের বছর থেকে স্বয়ংক্রিয় দরজার বাস পরিচালনার কথা ছিল। বাস্তবে সময় ও ব্যয় বেড়েছে কিন্তু প্রকল্পটি শেষ হয়নি। সর্বশেষ ২০২৫ সালে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ সময় এবং ব্যয় আরও বাড়িয়ে প্রকল্পটি চতুর্থবারের মতো সংশোধনের প্রস্তাব দিয়েছে।

বিশ্বের জনবহুল শহরগুলোতে বিআরটির মতো প্রকল্প অত্যন্ত কার্যকর ও ফলপ্রসূ হলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা ব্যর্থতার গল্পে পরিণত হয়েছে। একদিকে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়, অন্যদিকে বছরের পর বছর ধরে মানুষের দুর্ভোগের সমার্থক হয়ে উঠেছে চাপিয়ে দেওয়া এ প্রকল্পটি। এর একমাত্র কারণ হলো বিদেশি ঋণে নেওয়া প্রকল্পটির নকশাগত ত্রুটি ছিল, সম্ভাব্যতা যাচাইও ঠিকমতো করা হয়নি। এর ফলে ২৫টি স্টেশনের ১৫টি অবকাঠামো নির্মাণ হলেও সেগুলো কোনো কাজে আসছে না; চলন্ত সিঁড়িসহ অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষয়ে যাচ্ছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রকল্পটি পর্যালোচনার জন্য সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় দুটি কমিটি করেছিল। প্রতিবেদন দুটি পর্যালোচনা করে বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দল গত মাসে যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, সেখানে বিআরটি কার্যক্রম পুরোপুরি বাতিল করে বিদ্যমান অবকাঠামোকে উন্নত মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহারের সুপারিশ করেছে। যদিও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) মনে করছে, অবকাঠামোগত কাজের মাত্র ৩ শতাংশ বাকি থাকা অবস্থায় প্রকল্পটি বাতিল করা ঠিক হবে না।

বাস্তবতা হচ্ছে, এখন প্রকল্পটি ভাঙতে গেলেও স্টেশন, র‍্যাম্প ও এস্কেলেটর অপসারণ এবং ঠিকাদারদের ক্ষতিপূরণ বাবদ এক হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হতে পারে। অন্যদিকে প্রকল্পটি চালু রাখতে গেলে বিদ্যমান নকশাগত ত্রুটি কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি শুধু বাস কিনতেই নতুন করে আরও সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা খরচ হবে। এ ছাড়া জনবল নিয়োগ, রক্ষণাবেক্ষণ খরচসহ বিপুল অর্থ ব্যয় হবে। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, সরকারি ব্যবস্থাপনায় এত বড় প্রকল্প পরিচালনা করে সেটি কার্যকর, লাভজনক ও টেকসই করা সম্ভব নয়।

এ ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ নেই যে চাপিয়ে দেওয়া বিআরটি প্রকল্প সরকারের জন্য গলার কাঁটা হয়ে উঠেছে। নাগরিক স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবং প্রয়োজনে যোগাযোগবিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে আরও মতামত নিয়ে সরকারকে সঠিক, যৌক্তিক ও সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিআরটি যেন আরও বড় ব্যর্থতার গল্প না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখা প্রয়োজন।

বুয়েটের প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে প্রকল্প ব্যর্থ হওয়ার পেছনে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রস্তুতকারী, নকশা প্রণয়নকারী পরামর্শক এবং পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে যুক্ত সরকারি কর্মকর্তাদের দায়ী করা হয়েছে। অর্থায়নকারী সংস্থা, প্রকল্প পরিচালনা কমিটি, সরকারের বাস্তবায়ন ও মূল্যায়ন বিভাগ এবং পরিকল্পনা কমিশনও দায় এড়াতে পারে না।

আমরা মনে করি, এ রকম একটি অকার্যকর ও দায়িত্বহীন প্রকল্প যারা চাপিয়ে দিয়েছে, তাদের সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। ভবিষ্যতে যাতে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি না হয়, সেটা নিশ্চিত করার জন্য জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার নজির সৃষ্টি করা প্রয়োজন।