কেউ নতুন চাকরিতে যোগ দিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন, কেউ ছুটির আনন্দে স্বজনদের কাছে ছুটে যাচ্ছিলেন, আবার কেউ বের হয়েছিলেন জীবিকার তাগিদে। কিন্তু কারও গন্তব্যে পৌঁছানো হলো না; একনিমেষেই অকাতরে ঝরে গেল বহু প্রাণ, নিভে গেল একাধিক পরিবারের স্বপ্ন। ২০ অক্টোবর নাটোরের বড়াইগ্রামে নাটোর-পাবনা মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১২ জনের করুণ মৃত্যু আমাদের গভীরভাবে মর্মাহত করেছে।
সড়কপথ যে বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য এক নিরবচ্ছিন্ন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে, তা কিছুদিন পরপরই এমন হৃদয়বিদারক সংবাদে আমরা টের পাই। ২০১৪ সাল থেকে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত ৭২ হাজার ৭৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন নিহত হয়েছেন। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির এ তথ্যই প্রমাণ করে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা কতটা ভয়াবহ মহামারিতে রূপ নিয়েছে। আমাদের সমাজেও সড়ক দুর্ঘটনার প্রভাব কতখানি গভীর, তার একটি বড় নজির ছিল ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের সংঘটিত বিশাল আন্দোলন।
জানা যাচ্ছে, দুর্ঘটনাকবলিত বাসটির মূল চালক ও সহকারী পেছনে ঘুমাচ্ছিলেন এবং গাড়িটি চালাচ্ছিলেন বাসের সুপারভাইজার। এমন চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন ও অপেশাদার আচরণের কারণে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার খবর আমরা প্রায়ই পেয়ে থাকি। তবে কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার সামগ্রিক পরিস্থিতি যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাকে কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি একধরনের কাঠামোগত হত্যাকাণ্ডে পরিণত হয়েছে।
সড়কে প্রতিদিনের এই মৃত্যুর মিছিলের কারণগুলো আমাদের অজানা নয়। বিভিন্ন সময়ে গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা অদক্ষ চালক, ভুয়া লাইসেন্স, অনিয়ন্ত্রিত গতি, বেপরোয়া ওভারটেকিং, বিশ্রামহীন দীর্ঘ ডিউটি এবং অবকাঠামোগত ত্রুটির পাশাপাশি দুর্বল নজরদারি ব্যবস্থাকে কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। যেমন বিআরটিএর নিবন্ধন ও লাইসেন্স ব্যবস্থার চরম শিথিলতার কারণে বিপুলসংখ্যক যানবাহন দক্ষ চালক ছাড়াই চলছে।
একইভাবে চালকদের নির্দিষ্ট বেতন ও নিয়ন্ত্রিত কর্মঘণ্টা না থাকায় ক্লান্তি ও ঘুমের ঘোরে তাঁরা নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন কিংবা হেলপার ও সুপারভাইজারের হাতে স্টিয়ারিং সঁপে দিচ্ছেন। নাটোরে বাসচালকের ঘুমিয়ে থাকা এবং সুপারভাইজারের গাড়ি চালানোর বিষয়টি এই চরম অব্যবস্থাপনারই এক নগ্ন বাস্তব রূপ।
এই অতিপরিচিত কারণগুলো আমাদের নীতিনির্ধারকদের জানা থাকলেও বাস্তবে তা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ে না। যেকোনো দুর্ঘটনার পর কেবল তদন্ত কমিটি গঠন আর মামলা দায়েরের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থেকে এখন কঠোর ও স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রোড সেফটি অডিট জোরদার করা, মহাসড়কে প্রযুক্তিভিত্তিক ট্রাফিক নজরদারি এবং গতিসীমা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা প্রয়োজন।
পাশাপাশি দক্ষ চালক তৈরি, যথাযথ পরীক্ষার মাধ্যমে লাইসেন্স প্রদান, চালকদের কর্মঘণ্টা নির্ধারণ এবং ফিটনেসবিহীন গণপরিবহন সড়ক থেকে চিরতরে অপসারণ করতে হবে। এর পাশাপাশি দীর্ঘ মেয়াদে সড়কের ওপর চাপ কমাতে রেল ও নৌপথকে আধুনিক ও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া আবশ্যক।
সড়ক নিরাপত্তার এসব সিদ্ধান্ত কেবল প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিকও। বিভিন্ন সময়ে আমরা দেখেছি এই খাতের নানা উদ্যোগ রাজনৈতিক দেনদরবার ও কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর চাপে আটকে গেছে। নাটোরে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার শিকার এক ভুক্তভোগীর স্বজন আক্ষেপ করে বলছিলেন, একটি দুর্ঘটনায় সব শেষ হয়ে গেল! তাঁর এই হাহাকারকে কোনো গাণিতিক পরিসংখ্যানে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আর কত প্রাণ ঝরলে, আর কত পরিবারের এভাবে ‘সব শেষ’ হয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ঘুম ভাঙবে? আর কত মৃত্যুর পর আমরা সড়ককে নিরাপদ করার কাজটি অগ্রাধিকার দিয়ে শুরু করব?