ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে

সম্পাদকীয়

নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য-উপাত্তের গোপনীয়তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্বগুলোর একটি। বর্তমানে ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দুনিয়ায় তথ্য সরবরাহের পদ্ধতি ও প্রভাবের বিচিত্রতা ও তীব্রতার কারণে ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা আরও গুরুতর বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সম্প্রতি প্রথম আলোতে প্রকাশিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভোটার তালিকা কেনাবেচার সংবাদ নাগরিকদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলার জন্য যথেষ্ট।

ডিজিটালি রাইটসের তথ্য যাচাইয়ের উদ্যোগ ‘ডিসমিস ল্যাব’-এর অনুসন্ধান থেকে জানা গেছে, ফেসবুক ও টেলিগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে মাত্র ৩০ থেকে ২৫০ টাকার বিনিময়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা কেনাবেচা হচ্ছে। এই তালিকায় ভোটারের নাম, নম্বর, পিতা-মাতার নাম, জন্মতারিখ, পেশা ও স্থায়ী ঠিকানার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য রয়েছে। ইন্টারনেটের ‘খোলা ময়দানে’ নাগরিকের সংবেদনশীল তথ্যের এমন বেচাকেনা কেবল যে নাগরিকের গোপনীয়তার অধিকারই ক্ষুণ্ন করছে তা নয়; বরং নাগরিকের জীবনযাপনকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলার মতো উদ্বেগজনক।

প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যাচ্ছে, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে নির্বাচন কমিশন মনোনীত প্রার্থীদের কাছে যে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা সরবরাহ করা হয়েছিল, তা চলে গেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন গোষ্ঠীর কাছে। তারা রীতিমতো প্রকাশ্যে বিজ্ঞাপন দিয়ে সে তালিকা বিক্রি করছে।

নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, কমিশনের পক্ষ থেকে বিক্রির কোনো অনুমতি না থাকলেও বিগত নির্বাচনে মনোনীত প্রার্থীদের সরবরাহ করা ছবিবিহীন পিডিএফ তালিকাটিই কোনোভাবে বাইরে চলে গেছে। কোনো কম্পিউটারের দোকান থেকে এই তালিকা কপি হতে পারে বলে তাঁরা অনুমান করছেন। কিন্তু নাগরিকের সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য-উপাত্ত নিয়ে এ ধরনের বক্তব্য কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বাংলাদেশের নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার বেহাল এই এক ঘটনা থেকেই স্পষ্টত উন্মোচিত হয়ে গেছে।

এভাবে সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকির দিকেও বিশেষজ্ঞরা ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, এভাবে ফাঁস হওয়া তথ্যের সাহায্যে ভুয়া পরিচয়পত্র তৈরি করে বিভিন্ন পরিষেবার জন্য চেষ্টা চালানোসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জালিয়াতির চেষ্টাও করা সম্ভব। এমনকি অন্যের নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাইবার অপরাধ চালানোও সম্ভব হবে বলে তাঁরা অনুমান করেছেন।

আমরা মনে করি, এই পুরো ঘটনায় ইসি তাদের গাফিলতি এড়াতে পারে না। এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত যেমন দরকার, তেমনি নাগরিকের তথ্য সুরক্ষায় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণও দরকার। এ ক্ষেত্রে ‘ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২৬’-কে ব্যবহার করা যেতে পারে বলে আমরা মনে করি। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেসব প্ল্যাটফর্ম অবাধে এ ধরনের তথ্য বিক্রি করছে, তাদের তদারকির আওতায় আনার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা এখনো নেই। অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম নাগরিকের তথ্য সুরক্ষা ও জালিয়াতির বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান জানালেও তৃতীয় বিশ্বের ক্ষেত্রে তাদের উদাসীনতার কথাও বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।

সরকারের উচিত এ বিষয়ে আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করা। ফেসবুক ও টেলিগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে এমন বিজ্ঞাপন ও পোস্ট দ্রুত অপসারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তদারকি বাড়াতে হবে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার জন্য নির্বাচন কমিশনসহ নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য সুরক্ষায় বাজেট বৃদ্ধি এবং নিয়মিত স্বাধীন অডিট বাধ্যতামূলক করতে হবে। নাগরিকের তথ্য-উপাত্ত সুরক্ষা রাষ্ট্র ও সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের কার্যকর ভূমিকা আমরা দেখতে চাই। একটা রাষ্ট্রের নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য এভাবে অরক্ষিত থাকতে পারে না।