১০ বছরের মুনাফার অর্থ কোথায় গেল

সম্পাদকীয়

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে শুধু সংঘাতের পরিবেশ তৈরি করেনি; বৈশ্বিক জ্বালানিবাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের ক্ষেত্রে এটা একটা অভাবনীয় সংকট। যুদ্ধের কারণে শুধু জ্বালানি তেল ও এলএনজির দাম বাড়েনি; জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় জাহাজ ভাড়া, যুদ্ধঝুঁকির বিমা, পরিবহন ব্যয়সহ অন্যান্য খরচও বেড়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারকে তেল ও বিদ্যুতের দাম এক দফা বাড়াতে হয়েছে। সামষ্টিক অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতিতে তার প্রভাবও পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও প্রলম্বিত হলে জ্বালানির জন্য বাংলাদেশের ওপর আরও বড় চাপ তৈরি হবে।

এমন পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) নগদ অর্থের সংকটে পড়ার খবর উদ্বেগজনক বলেই আমরা মনে করি। প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটিকে গত চার মাসে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য সংরক্ষিত প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা চলতি মূলধন হিসেবে ব্যবহার করতে হয়েছে। এ সময় বিভিন্ন ব্যাংকে গচ্ছিত বিপিসির আমানতও কমেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিপিসি এখন সরকারের কাছে ১৮ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকার আর্থিক সহায়তা চেয়েছে।

আর্থিক সংকটে জ্বালানি তেল আমদানি যেন কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়, সে জন্য সরকারকে আগেভাগেই যৌক্তিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। কেননা, সরবরাহে কিছুটা ঘাটতি থাকলে কত বড় সংকট তৈরি হয়, সেটা আমরা মার্চ-এপ্রিল মাসে দেখেছি। ঢাকাসহ সারা দেশে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতে হয়েছে। কৃষকেরা ঠিকমতো তেল না পাওয়ায় বোরো ধানের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়; লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উৎপাদন হয় কম। এ ছাড়া গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত দুটি এলএনজি টার্মিনালের একটির বয়লার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে দেশে তীব্র গ্যাস–সংকট সৃষ্টি হয়। ফলে শিল্পকারখানার উৎপাদন প্রায় ৪০ শতাংশ কমে যায়, উদ্যোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। বাসাবাড়িতে রান্নার গ্যাস না পাওয়ায় এবং লোডশেডিংয়ের কারণে নাগরিকদের মধ্যে অসন্তোষ জন্ম হয়। ফলে জ্বালানি খাতে যাতে নতুন কোনো সংকট তৈরি না হয়, সেদিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

তবে তেল আমদানি অব্যাহত রাখার জন্য সরকারের কাছে আর্থিক সহায়তা চাওয়ায় যে প্রশ্ন সামনে এসেছে, সেটা হলো এত মুনাফা করার পরও বিপিসি কীভাবে তারল্যসংকটে পড়ে? ২০২৩ সালের পর থেকে সংস্থাটি মুনাফা করে এসেছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছরে সংস্থাটি মুনাফা করে ৫৫ হাজার কোটি টাকা। সংস্থাটি অবশ্য দাবি করেছে, মুনাফার বড় অংশ (৩৪ হাজার কোটি টাকা) সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। মুনাফার অর্থ যদি বিপিসির কাছে থাকত, তাহলে জরুরি আপৎকালীন সময়ে সেখান থেকে নিয়ে আর্থিক চাপ কিছুটা হলেও মোকাবিলা করা সম্ভব ছিল। সেটা হয়নি বলেই বিপিসিকে উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা ব্যবহার ও সরকারের কাছে আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে।

রাষ্ট্রীয় সংস্থা হিসেবে বিপিসি মুনাফা করতে পারে কি না, সেই অর্থ অন্য খাতে ব্যয় হতে পারে কি না, এ বিতর্ক অনেক পুরোনো। আমরা মনে করি, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বিপিসির ‘মুনাফার কতটা সরকারের কোষাগারে গেছে, কতটা সংস্থার কাছে সংরক্ষিত ছিল এবং কতটা অন্য খাতে ব্যয় হয়েছে, সেটিও জনসমক্ষে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন’ বলে অভিমত দিয়েছেন, সেটা যথার্থ। বিপিসিতে অবশ্যই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।