জুন মাস কি আর শেষ হবে না

সম্পাদকীয়

সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে যাদুকাটা নদীর ওপর নির্মাণাধীন ‘শাহ আরেফিন (রহ.)-অদ্বৈত মহাপ্রভু মৈত্রী সেতু’ যেন সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতা ও জবাবদিহির ঘাটতির একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। ৭৫০ মিটার দীর্ঘ এই সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালের মার্চে। ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৮৬ কোটি টাকা এবং কাজ শেষ করার সময়সীমা ছিল ৩০ মাস। অর্থাৎ ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরেই সেতুটি চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই সময়সীমা পেরিয়ে গেছে প্রায় ছয় বছর আগে। চার বছর ধরে এলাকাবাসী শুনে আসছেন ‘আগামী জুনে’ কাজ শেষ হবে। এখন আবার বলা হচ্ছে, কাজ শেষ হতে লাগবে আরও দুই বছর—নতুন লক্ষ্যমাত্রা ২০২৮ সালের জুন।

এটি শুধু সময়ক্ষেপণের ঘটনা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সরকারি অর্থের অপচয়, জনগণের ভোগান্তি এবং উন্নয়ন পরিকল্পনার বিশ্বাসযোগ্যতা। এরই মধ্যে সেতুর ৭৫টি গার্ডারের মধ্যে ৫৩টি এবং ১৫টি স্ল্যাবের মধ্যে ১০টির কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু গত ১৯ মে রাতে কাজ চলার সময় পাঁচটি গার্ডার নদীতে ভেঙে পড়ার ঘটনায় প্রকল্পটির নির্মাণ মান নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। এরপর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, এত দিন ধরে কাজের গতি ও মান পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষ কী করেছে?

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে করোনা, বন্যা, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি কিংবা যোগাযোগ সমস্যার মতো নানা কারণ দেখানো হয়েছে। এসব বাস্তব সমস্যা হতে পারে। কিন্তু একটি প্রকল্প বছরের পর বছর পিছিয়ে যাওয়ার যৌক্তিকতা হিসেবে এগুলো অনন্তকাল ব্যবহার করা যায় না। বিশেষ করে যখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বারবার তাগাদা দিয়েও কাজ এগিয়ে নিতে পারেনি। গত বছর ঠিকাদার কাজ ফেলে চলে যাওয়ার পরও কেন দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, সেই প্রশ্নের উত্তরও প্রয়োজন।

এই সেতুর গুরুত্ব কেবল স্থানীয় যোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি চালু হলে তাহিরপুর, মধ্যনগর ও বিশ্বম্ভরপুরসহ বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের যোগাযোগ সহজ হবে। ঢাকা থেকে মধ্যনগরের মহিষখলা পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগ তৈরি হলেও যাদুকাটা নদী যেন সেই যোগাযোগব্যবস্থার একটি বড় বাধা হয়ে আছে। খেয়া পারাপারের সময় দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। ফলে শুধু উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে নয়, নিরাপদ যোগাযোগের জন্যও সেতুটি প্রয়োজন।

এখন নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করে দ্রুত কাজ শেষ করার কথা বলা হচ্ছে। শুধু নতুন সময়সীমা ঘোষণা করলেই হবে না, ২০২৮ সালের জুন যেন আরেকটি ‘আগামী জুন’ হয়ে না যায়, সে জন্য সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা, মাসভিত্তিক অগ্রগতি, নির্মাণ মানের কঠোর তদারকি এবং নিয়মিত অগ্রগতি জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। একই সঙ্গে গার্ডারধসের কারণ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায় নির্ধারণ জরুরি।