সুষ্ঠু নির্বাচনে গণতন্ত্রের যাত্রা সুদৃঢ় হোক

সম্পাদকীয়

স্বাগত ২০২৬। খ্রিষ্টীয় নতুন বছরের সূচনা হলো আজ। শেষ হওয়া ২০২৫ সালটি ছিল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নানা কারণেই ঘটনাবহুল। যুগপৎ অনিশ্চয়তা ও আশাবাদের দোলাচল নিয়েই নতুন একটি বছরের যাত্রা শুরু হলো। বাংলাদেশে মব সহিংসতা, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক বিভেদের মধ্যেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল নাগরিকদের মধ্যে গণতান্ত্রিক উত্তরণ প্রশ্নে আশাবাদ তৈরি করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর যে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেছেন, তার অভিঘাত গোটা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও পড়েছে।

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৫ সালে ভেঙে পড়া অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন, আইনশৃঙ্খলাব্যবস্থা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা এবং দেশকে গণতান্ত্রিক ধারায় এগিয়ে নেওয়ার গুরুদায়িত্ব এসে পড়ে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর। এই লক্ষ্যে সরকার বেশ কয়েকটি সংস্কার কমিশন গঠন করে। কমিশনগুলো প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর যাত্রা শুরু হয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের। গণ–অভ্যুত্থানের পক্ষের প্রায় সব কটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঐকমত্য কমিশন আলোচনার পর তৈরি হয় জুলাই সনদ। প্রথম পর্যায়ে ৩৩টি এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ৩০টি দলের সঙ্গে দীর্ঘ সংলাপের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র সংস্কারে একটি ঐকমত্যে পৌঁছানো বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল ঘটনা।

১৭ অক্টোবর জুলাই সনদে স্বাক্ষর হলেও গণভোটের তারিখ ও সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে মতভেদ তৈরি হওয়ায় রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারায় অন্তর্বর্তী সরকার নিজেই সিদ্ধান্ত নেয় এবং জট খোলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের। ১১ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করে জানায়, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। তফসিল অনুযায়ী ২৯ ডিসেম্বর ছিল মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। ইসির তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে, ৩০০ সংসদীয় আসনে দলীয় ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে প্রায় ২ হাজার ৫৮২টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। নতুন বছরে দেশবাসী একটি নিরাপদ ও উৎসবমুখর নির্বাচনী পরিবেশের প্রত্যাশা করেন।

বিগত বছরজুড়েই নাগরিকদের প্রধান উদ্বেগ ছিল নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। মব সহিংসতা, চাঁদাবাজি, চুরি-ডাকাতি, লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় জননিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা বিরাজ করেছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ২০২৫ সালে মব সন্ত্রাসে কমপক্ষে ১৯৭ জন নিহত হয়েছেন। মাজারে হামলা, বাউল সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ, নারী ও সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়নের ঘটনা বন্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে মৃত্যুও বন্ধ হয়নি।

তফসিল ঘোষণার পর ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনা রাজনৈতিক ও সামাজিক অসন্তোষ তৈরি করে। প্রথম আলোডেইলি স্টার কার্যালয়, ছায়ানট ও উদীচীতে সন্ত্রাসী হামলা এবং সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয় ভূমিকা নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগের জন্ম দেয়। এসব ঘটনা নির্বাচনের পরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন জন্ম দেয়। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডন থেকে দেশে ফেরার ঘটনা নির্বাচনের পরিবেশ তৈরিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলেই আমরা মনে করি।

৩০ ডিসেম্বর বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যু বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও রাজনীতিতে বড় শূন্যতা তৈরি করল। তাঁর জানাজায় দলমত-নির্বিশেষে জনতার ঢল প্রমাণ করল গণতন্ত্র, ত্যাগ ও আপসহীন রাজনীতির প্রতি এ দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা কতটা প্রবল। নির্বাচনী বছরে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্ব নাগরিকদের এই আকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান জানাবেই বলে আমরা আশা করি।

২০২৬ সবার জন্য সুখ ও সমৃদ্ধি বয়ে আনুক। সবাইকে খ্রিষ্টীয় নববর্ষের শুভেচ্ছা।