ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে ইউরোপ, বিশেষত ইতালি যাওয়ার পথে বাংলাদেশি তরুণদের নিখোঁজ ও মৃত্যুর ঘটনা নতুন নয়। সর্বশেষ মাদারীপুরের ১০ জন তরুণের দীর্ঘ প্রায় ১০ মাস ধরে নিখোঁজ থাকার তথ্য যে গভীর মানবিক সংকটের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে, তা আর কোনোভাবেই উপেক্ষার সুযোগ রাখে না। পরিবারগুলো আজও জানে না, তাদের সন্তানেরা জীবিত আছেন, নাকি ভূমধ্যসাগরের নীরব অতল গহ্বরে চিরতরে বিলীন হয়ে গেছেন। এই অনিশ্চয়তা কেবল ব্যক্তিগত শোক নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের নৈতিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।
প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিখোঁজ তরুণদের পরিবার দালাল চক্রকে জনপ্রতি ২৮ থেকে ৩০ লাখ টাকা দিয়েছে, যা গ্রামীণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য সর্বস্বান্ত হওয়ারই শামিল। তথাকথিত ‘কম খরচে ইতালি’ পৌঁছে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে প্রথমে দুবাই, পরে লিবিয়ায় পাচার করা হয় এই তরুণদের। সেখানে তাঁদের বন্দিশালায় আটকে রেখে পরিবারের কাছ থেকে আরও ১৩-১৫ লাখ টাকা করে মুক্তিপণ আদায় করা হয়। এরপর অতি হালকা ও অনিরাপদ নৌযানে ঠেলে দেওয়া হয় ভূমধ্যসাগরের মৃত্যুপথে। এই পথ যে নিছক যাত্রাপথ নয়, বরং এক ভয়াল মৃত্যুফাঁদ, তা প্রমাণিত বহুবার। কারও খোঁজ মেলে না, কারও লাশ ভেসে আসে সাগরে। তবু এই চক্র নির্বিঘ্নে সক্রিয় থাকে।
এই ভয়াবহ মানব পাচার কেবল দালাল চক্রের অপরাধে সীমাবদ্ধ নয়; এর সমান দায় রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের। আরও নির্দিষ্ট করে বললে স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা এই অপরাধকে দীর্ঘদিন ধরে পুষ্ট করেছে। মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, লিখিত অভিযোগ না পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়। এই বক্তব্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার একটি কাগুজে অজুহাত মাত্র। প্রশ্ন হলো, নিখোঁজের ঘটনা, পরিবারগুলোর আহাজারি, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য—এসব কি রাষ্ট্রকে নড়াচড়া করানোর জন্য যথেষ্ট নয়? প্রশাসন কি কেবল অভিযোগ গ্রহণকারী একটি যান্ত্রিক দপ্তর, নাকি নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তার অভিভাবক?
রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিককে শুধু আইন দেখানো নয়; জীবন রক্ষা করা, অপরাধ প্রতিরোধ করা এবং সংঘবদ্ধ মানব পাচারের মতো ভয়াবহ অপরাধ নির্মূলে সক্রিয় ভূমিকা রাখা। এখানে প্রশাসনের যে উদাসীনতা ও নিষ্ক্রিয়তা প্রকাশ পাচ্ছে, তা নিছক অবহেলা নয়, এটি ন্যায়বিচার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার নামান্তর। এই নীরবতা দালাল চক্রকে আরও বেপরোয়া করে তুলছে এবং তরুণদের জীবনকে ঠেলে দিচ্ছে অনিবার্য বিপর্যয়ের দিকে।
একই সঙ্গে সমাজের ভেতরেও গভীর আত্মসমালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। বিদেশযাত্রাকে একমাত্র মুক্তির পথ হিসেবে দেখার মানসিকতা, দ্রুত বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন এবং ঝুঁকির ভয়াবহতা সম্পর্কে অজ্ঞতা—এই সবকিছু মিলেই দালাল চক্রের জন্য উর্বর জমি তৈরি করেছে। পরিবার, স্থানীয় সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনপ্রতিনিধিদের সম্মিলিতভাবে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।