বর্জ্য অপসারণে দায়িত্বশীলতা জরুরি

সম্পাদকীয়

আজ পবিত্র ঈদুল আজহা। ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত এ উৎসবের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ পশু কোরবানি। তবে ধর্মীয় এই বিধান পালনের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা এখন নাগরিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের বড় অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ সব কটি বড় শহর, সব সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় কোরবানির বর্জ্য দ্রুত অপসারণের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে, তা বাস্তবায়নে প্রশাসন ও নাগরিকদের সমন্বিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য।

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম ঘোষণা করেছেন, ঈদের দিন দুপুর ১২টা থেকে দিবাগত রাত ১২টার মধ্যে অর্থাৎ ১২ ঘণ্টার মধ্যে দেশজুড়ে কোরবানির বর্জ্য অপসারণ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ বিষয়ে বিশেষ অনুশাসন জারি করেছেন, যা এ কাজের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। লক্ষণীয়, দেশের প্রধান প্রধান সিটি করপোরেশন একে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ৮ ঘণ্টার মধ্যে বর্জ্য সরানোর লক্ষ্য নিয়েছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন মাত্র ৬ ঘণ্টার মধ্যে নগরী পরিষ্কার করার উচ্চাভিলাষী কিন্তু প্রশংসনীয় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধু ঢাকা শহরেই প্রায় ৯ লাখ পশু কোরবানির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, যা থেকে ৪০ হাজার টনের বেশি বর্জ্য উৎপন্ন হতে পারে। এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্য যদি দ্রুত সরানো না যায়, তবে বর্ষার মৌসুমে বৃষ্টি আর পচনশীল বর্জ্য মিলে শহরগুলোয় এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। ড্রেনেজ–ব্যবস্থা বন্ধ হওয়া থেকে শুরু করে সংক্রামক ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় এবার পাটের ব্যাগ সরবরাহ এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও যানবাহনের সংখ্যা বাড়ানোর যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। চট্টগ্রামের মেয়র কর্তৃক অবিক্রীত বা নষ্ট কাঁচা চামড়া সংগ্রহের জন্য আলাদা ট্রাকের ব্যবস্থা করার বিষয়টিও অত্যন্ত সময়োপযোগী, যা পরিবেশদূষণ রোধে বড় ভূমিকা রাখবে।

তবে বর্জ্য অপসারণের এই চ্যালেঞ্জ কেবল সিটি করপোরেশনের ওপর চাপিয়ে দিলে চলবে না। এখানে সাধারণ নাগরিকদের সচেতনতা সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে। সরকার ও সিটি করপোরেশন থেকে নির্ধারিত স্থানে পশু জবাই করার যে অনুরোধ জানানো হয়, তা মানার ক্ষেত্রে অনীহা আমাদের চিরচেনা চিত্র। রাস্তা বা অলিগলিতে পশু জবাই করার কারণে বর্জ্য সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। নাগরিকদের উচিত পশুর রক্ত ও অপ্রয়োজনীয় অংশ যত্রতত্র না ফেলে নির্ধারিত ব্যাগে রাখা এবং জবাইয়ের স্থানটি দ্রুত পানি ও ব্লিচিং পাউডার দিয়ে পরিষ্কার করা।

পরিশেষে বর্জ্য অপসারণের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল করতে শুধু মাঠপর্যায়ের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ওপর নির্ভর করলে হবে না; প্রয়োজন কঠোর তদারকি। ঈদের আনন্দ যেন পরিবেশদূষণের কারণে বিষাদে পরিণত না হয়, সেদিকে আমাদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। বর্জ্যমুক্ত শহর উপহার দেওয়ার দায়িত্ব যেমন কর্তৃপক্ষের, তেমনি সেই কাজে সহায়তা করা আমাদের সবার নাগরিক দায়িত্ব। প্রশাসনের দৃঢ়তা আর জনগণের সচেতনতা—এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই সম্ভব একটি পরিচ্ছন্ন ও সুস্বাস্থ্যময় ঈদ।