আট বছরেও কেন নির্মাণ শেষ হয় না

সম্পাদকীয়

নড়াইলের কালিয়া উপজেলার নবগঙ্গা নদীর ওপর নির্মাণাধীন বারইপাড়া সেতুটি এখন স্থানীয় মানুষের কাছে এক দীর্ঘস্থায়ী আক্ষেপের নাম। যে সেতুর কাজ দেড় বছরে শেষ হওয়ার কথা ছিল, নকশাগত জটিলতা আর আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কারণে তা আট বছরেও আলোর মুখ দেখেনি। একটি উন্নয়ন প্রকল্প কতটা সমন্বয়হীনতার শিকার হতে পারে, এই সেতু তার এক বড় উদাহরণ।

নড়াইল সদর ও কালিয়া উপজেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগের মাধ্যম হতে যাওয়া এই সেতুর বিলম্বিত নির্মাণ কেবল জনভোগান্তিই বাড়ায়নি, বরং প্রকল্পের ব্যয়ও বাড়িয়ে দিয়েছে দ্বিগুণের বেশি। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া ৬৫ কোটি টাকার প্রকল্পটি এখন নকশা পরিবর্তন ও কালক্ষেপণের কারণে ১৩৫ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। শুরুতে নবগঙ্গা নদীকে ‘সি’ গ্রেডে রেখে নকশা করা হলেও পরবর্তী সময়ে বিআইডব্লিউটিএ নদীটিকে ‘বি’ গ্রেডে উন্নীত করে। এই যে গ্রেড পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত এবং তার ভিত্তিতে নকশা বদল—এতে কেন এত দীর্ঘ সময় অপচয় হলো, তার সদুত্তর নেই। সরকারি টাকার এই যে বাড়তি ব্যয়, তা কি সমন্বয়হীনতার চরম বহিঃপ্রকাশ নয়? একটি উন্নয়ন প্রকল্প শুরুর আগে কেন নদীর গতিপ্রকৃতি ও প্রয়োজনীয় গ্রেডিং সঠিকভাবে পর্যালোচনা করা হলো না?

এদিকে সেতুর কাজ ঝুলে থাকায় কালিয়া উপজেলার প্রায় দুই লাখ মানুষের দৈনন্দিন জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। কালিয়া থেকে নড়াইল সদরের হাসপাতাল, ভূমি কার্যালয় বা সরকারি দপ্তরে যাওয়ার জন্য মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা খেয়াঘাটে বসে থাকতে হচ্ছে। বিশেষ করে মুমূর্ষু রোগী পারাপারে এই দেরি অনেক সময় প্রাণঘাতী হয়ে দাঁড়ায়। শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের ঝুঁকি নিয়ে ট্রলারে নদী পার হতে হচ্ছে, যা বর্ষাকালে স্রোতের তীব্রতায় অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। এলাকার মানুষের ভাষ্য অনুযায়ী, এই দুর্ভোগ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।

বর্তমানে সেতুর ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর দাবি করছে। নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী আগামী ৩০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। আমরা চাই না এই আশ্বাস কেবল আরেকটি ‘নতুন মেয়াদ’ বৃদ্ধির নাটক হয়ে থাক। নড়াইল, কালিয়া, বাগেরহাট ও গোপালগঞ্জের সংযোগকারী এই সেতুর গুরুত্ব অপরিসীম। এটি চালু হলে ওই অঞ্চলের কৃষি ও অর্থনীতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার হবে।

আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাই, আর কোনো অজুহাত নয়; নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই বারইপাড়া সেতুর কাজ সম্পন্ন করে তা জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দিন। উন্নয়ন যখন দীর্ঘসূত্রতার জালে আটকে যায়, তখন তা উপকারের চেয়ে ভোগান্তিই বেশি দেয়।