বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুমসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জড়িত থাকার কারণে নানা পক্ষ থেকে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্তির সুপারিশ এসেছে জোরালোভাবে। এরপরও অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এসে সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলে বাহিনীটির জন্য ১৬৩টি গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত কোন যুক্তিতে নেওয়া হচ্ছে, তা কোনোভাবেই বোধগম্য নয়। আমরা মনে করি, এই সিদ্ধান্ত সরকারের নীতিগত অবস্থানকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলবে।
১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সেই বিবেচনায় সরকারের হাতে মাত্র দুই সপ্তাহ সময় আছে। প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, গত মঙ্গলবার অর্থনৈতিক বিষয়–সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে র্যাবের জন্য ৩টি জিপ, ১০০টি টহল পিকআপ ও ৬০টি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত মাইক্রোবাস কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। দরপত্র ছাড়াই সরাসরি পদ্ধতিতে গাড়িগুলো কেনা হবে। প্রকল্পটি ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নেওয়া হয়েছিল। ১ হাজার ৩৪ কোটি টাকার প্রকল্প কাটছাঁট করে দাঁড়িয়েছে ৮২৭ কোটি টাকা। প্রকল্পটির আওতায় মোট ১ হাজার ৫৭০টি বিভিন্ন ধরনের যানবাহন এবং ১৩১টি সরঞ্জাম কেনার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। ইতিমধ্যে ৮০৯টি যানবাহন ও ১০১টি সরঞ্জাম কেনাও হয়েছে। নতুন গাড়িগুলো চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট থেকে কেনা হবে। সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে অনুমোদনের জন্য প্রকল্পটি পাঠানো হবে।
২০০৪ সালে র্যাব প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই বাহিনীটির বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাহিনীটির সদস্যদের গুম, নির্যাতন, বিরোধী মত দমন, বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের কাজে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র র্যাব ও র্যাবের কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানে হত্যা ও নিপীড়নের সঙ্গে র্যাব জড়িত ছিল।
সম্প্রতি গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন প্রধান উপদেষ্টার কাছে দেওয়া প্রতিবেদনে ভবিষ্যতে গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অবসান ঘটাতে র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাও নানা সময়ে র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করেছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তরের সুপারিশেও র্যাব বিলুপ্তি এবং সামরিক বাহিনীর সদস্যদের বেসামরিক কাজে সীমিত ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে।
ভবিষ্যতে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, বিরোধী মত দমনের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের কাজে কোনো সরকারই যাতে কোনো বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে না পারে, সে জন্য নিরাপত্তা খাতে সংস্কার জরুরি কর্তব্য ছিল। অথচ এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। র্যাব নিয়ে দেশ-বিদেশে সমালোচনা ও নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ থাকার পরও বাহিনীটির সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ চব্বিশের অভ্যুত্থানের চেতনাপরিপন্থী বলেই আমরা মনে করি। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান যথার্থই বলেছেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার র্যাবকে বিলুপ্ত না করে আরও বৈধতা দিচ্ছে, সক্ষমতা বাড়াতে গাড়ি কিনছে, এটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।’
গুমসংক্রান্ত কমিশনই যেখানে র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করেছে, সেখানে বাহিনীর অভিযান সক্ষমতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত সরকারের নীতিগত দ্বৈততার প্রতিফলন। এখানে প্রশ্ন ওঠাটা স্বাভাবিক, সরকার কি তাহলে কোনো স্বার্থান্বেষী মহলকে সুবিধা দেওয়ার জন্য এটা করছে। আমরা মনে করি, র্যাব বিলুপ্তির প্রশ্নে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।