সুষ্ঠু নির্বাচন চাইলে সংঘাত পরিহার করুন

নির্বাচন সামনে রেখে রাজপথে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, বিরোধী দল বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনগুলোর তৎপরতা বেড়েছে। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো দলের কর্মসূচি থাকছে। এসব কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হলে আমাদের কিছু বলার ছিল না। কিন্তু প্রায়ই রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘিরে হামলা-মামলা ও সংঘাতের ঘটনা ঘটছে; যা আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। 

প্রথম আলোর খবর থেকে জানা যায়, ২৬ আগস্ট কুমিল্লার লালমাই উপজেলার বেলঘর উত্তর ইউনিয়নের গৈয়ারভাঙা বাজারে বিএনপির নেতা-কর্মীদের ওপর আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতা-কর্মীরা হামলা চালিয়ে গুলি ছুড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে দুজন গুলিবিদ্ধসহ ২০ জন আহত হন। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক কামরুল হাসান হামলার কথা অস্বীকার করে উল্টো বিএনপির ওপর দোষ চাপিয়েছেন। লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হানিফ সরকার প্রথম আলোকে বলেন, বেলঘর উত্তর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির লোকজনের মধ্যে ঝামেলা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো ঝামেলা প্রশমনে তাঁরা কী করেছেন? 

কেবল কুমিল্লার লাইমাইয়ে নয়, অনেক স্থানেই সংঘাতের ঘটনা ঘটছে। উদাহরণ হিসেবে ২০ আগস্ট বিএনপির পদযাত্রা কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে চার জেলায় সংঘর্ষে ২০০ জন আহত ও ২১ জনকে আটক করা হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে। কর্মসূচিটি ছিল দেশের সব জেলায়। অন্যান্য জেলায় শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালিত হলেও ওই চার জেলায় কেন সংঘাত হলো, এর পেছনে কাদের প্ররোচনা ছিল, তা–ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। 

সাম্প্রতিক কালে দেখা যায়, বিরোধী দল কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করলে ক্ষমতাসীন দলও প্রায় একই সময়ে অনুরূপ কর্মসূচি নিয়ে থাকে। যে দলের হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আছে, তারা বিরোধী দলের একটি কর্মসূচি দেখে ভয় পেয়ে যাবে কেন? আমরা বরাবর রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে এসেছি যে তারা যেন পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি না নেয়। শান্তি বজায় রাখতে হলে আওয়ামী লীগকে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি থেকে বিরত থাকতে হবে। কর্মসূচি পালনের ক্ষেত্রে যঁাদের এতটুকু সহনশীলতা নেই, তাঁরা নির্বাচনের আগে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ আশা করেন কীভাবে? 

বিরোধী দলের কর্মসূচিতে সংঘাতের পাশাপাশি আরও একটি বিষয় রাজনৈতিক অঙ্গনকে উত্তপ্ত করছে। যেকোনো অঘটন ঘটলেই দেখা যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে পাইকারি মামলা করে এবং অজ্ঞাতনামা অসংখ্য ব্যক্তিকে আসামি করে। পরে সেই অজ্ঞাতনামাদের স্থলে সুবিধামতো নাম বসাতেও তারা কার্পণ্য করে না। এমনও দেখা গেছে, যাঁরা ক্ষমতাসীনদের হাতে আক্রান্ত হলেন, তাঁদের নামে মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়। 

সরকারের নীতিনির্ধারকেরা হামেশা বলে বেড়ান, তাঁরা একটি সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন চান। কিন্তু বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা করে কি সেই নির্বাচনের পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করা যাবে? নির্দলীয় না দলীয় সরকারের অধীন নির্বাচন হবে, সেই বিতর্কের বাইরেও অনেক প্রশ্ন আছে। 

সরকার যদি আরেকটি একতরফা ও জবরদস্তির নির্বাচন না চায়, তাহলে সংঘাতের রাজনীতি পরিহার করতে হবে। যারা সংঘাত করছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব হবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। সরকারি দলের নেতা-কর্মীদের টিকিটি স্পর্শ না করে, বেছে বেছে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের হয়রানি-গ্রেপ্তার করলে আর যা-ই হোক, নির্বাচনের সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা যাবে না।