সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার

সম্পাদকীয়

কয়েক মৌসুম ধরে যে ফসলের দাম নিয়ে দেশের বৃহৎ ভোক্তাসমাজে কোনো হা–হুতাশ দেখা যায়নি, আলু সেই ফসলের নাম। কিন্তু আলু তো কেবল ভোক্তার নিত্যদিনের খাবারই নয়, দেশের লাখো কৃষকের উপার্জনেরও ভরসা। কিন্তু টানা কয়েক মৌসুম ধরে সেই ভরসাই নড়বড়ে হয়ে পড়ছে। কখনো অতি ফলন, কখনো ফলনে ধস। ফলে কখনো উৎপাদন খরচ উঠছে না, কখনো ন্যায্য দাম মিলছে না। রাজশাহী, কুমিল্লা কিংবা কুড়িগ্রামের চরের চিত্র প্রায় একই। কৃষকেরা পরিশ্রম করছেন, ঝুঁকি নিচ্ছেন কিন্তু লাভের নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না।

এ সমস্যার মূল কারণ উৎপাদন বেশি হওয়া নয়। বড় সমস্যা হলো বাজার ব্যবস্থাপনা। একদিকে সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই, অন্যদিকে বাজারে কখন কী পরিমাণ আলু আসবে, তার কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা নেই। ফলে কোনো সময় হঠাৎ আলুর জোগান বেড়ে যায়, দাম পড়ে যায়। ক্ষতিটা পুরোপুরি কৃষকের ঘাড়েই এসে পড়ে।

বীজ, সার, কীটনাশক আর শ্রমিকের মজুরি—সবই বেড়েছে; কিন্তু সে অনুযায়ী আলুর দাম বাড়েনি। অনেক কৃষক ঋণ করে চাষ করেন। লোকসান হলে সেই ঋণ শোধ করাই কঠিন হয়ে পড়ে। এতে তাঁরা পরের মৌসুমে আরও বেশি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন। রোগবালাইয়ের ঝুঁকিও কম নয়। লেট ব্লাইটের মতো রোগ একবার ছড়িয়ে পড়লে পুরো খেত নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কৃষি বিভাগ সতর্ক করছে, পরামর্শ দিচ্ছে, যা অবশ্যই ভালো দিক। কিন্তু রোগের ঝুঁকি আর বাজারের ঝুঁকি মিলিয়ে কৃষকের চাপ কমছে না।

এ অবস্থা থেকে বের হতে কয়েকটি বিষয়ে এখনই গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, সংরক্ষণব্যবস্থা বাড়াতে হবে। প্রতিটি বড় উৎপাদন এলাকায় পর্যাপ্ত হিমাগার থাকা দরকার, যেখানে কৃষক সহজ শর্তে আলু রাখতে পারবেন। তাহলে সবাইকে একসঙ্গে কম দামে বিক্রি করতে হবে না। দ্বিতীয়ত, বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকারের সক্রিয় ভূমিকা দরকার। কোন এলাকায় কত জমিতে আলু হবে, সে পরিকল্পনা যদি আগে থেকেই করা যায়, তাহলে অতিরিক্ত উৎপাদনের চাপ কমবে। প্রয়োজনে সরকারি পর্যায়ে আলু কেনার ব্যবস্থাও রাখা যেতে পারে, যাতে দাম একেবারে ভেঙে না পড়ে। তৃতীয়ত, কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানোর দিকে নজর দিতে হবে। মানসম্মত বীজ আলু সহজ দামে সরবরাহ, সার ও কীটনাশকের সঠিক দাম নিশ্চিত করা এবং সহজ শর্তে কৃষিঋণ দেওয়া হলে কৃষকের ঝুঁকি কিছুটা কমবে। অতি ফলনের ক্ষেত্রে আলু রপ্তানির দিকেও সরকারের মনোযোগ বাড়াতে হবে।

আলু দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি ফসল। এ ফসলকে ঘিরে যদি কৃষক বারবার লোকসানে পড়েন, তাহলে তাঁরা চাষে আগ্রহ হারাবেন। এতে ক্ষতি হবে পুরো দেশের। আমরা আশা করি, সমন্বিত পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে আলুচাষিদের সংকট কমাতে সরকার পদক্ষেপ নেবে।