চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের প্রধান আকাঙ্ক্ষা ছিল বৈষম্য থেকে মুক্তি। সবাই প্রত্যাশা করেছিলেন, সরকারি চাকরিতে রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়, বরং মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হবে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, আগের ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তী ও বর্তমান সরকারের আমলেও সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে গোয়েন্দা দিয়ে যাচাই বন্ধ হয়নি। প্রথম আলোসহ গণমাধ্যমের খবর জানাচ্ছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার পরও কয়েক শ জন বাদ পড়েন। আইনে না থাকলেও পুলিশের পাশাপাশি একটি গোয়েন্দা সংস্থা যাচাই প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়। প্রার্থীদের সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্যের কারণে অনেক ব্যক্তি বাদ পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
দেশে ৬৫ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে শিক্ষক রয়েছেন প্রায় পৌনে চার লাখ। এসব বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের প্রায় ৩৬ হাজার পদ এবং সহকারী শিক্ষকের কয়েক হাজার পদ শূন্য রয়েছে। বাস্তবতা হলো, শিক্ষকের ঘাটতিতে অনেক প্রাথমিকেই ঠিকমতো পাঠদান করা যাচ্ছে না। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালে সহকারী শিক্ষক নিয়োগে যে পরীক্ষা নেওয়া হয়, সেই ফলাফলের ভিত্তিতে ১৪ হাজার ৩৮৪ জনকে চূড়ান্তভাবে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছিল। ২৪ সেপ্টেম্বর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের তালিকা প্রকাশ করলে বাদ পড়ার তথ্যটি বেরিয়ে আসে।
চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীদের অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। রাজধানী শাহবাগে দুই শতাধিক চাকরিপ্রার্থী নিয়োগের দাবিতে রোববার ও সোমবার অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাদ পড়ায় ভবিষ্যতে তাঁরা সরকারি চাকরি পাবেন কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগে চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্তদের পর্যায়ক্রমে নিয়োগপত্র দেওয়া হচ্ছে। ১ অক্টোবর পর্যন্ত এ প্রক্রিয়া চলবে। তখন চূড়ান্তভাবে জানা যাবে কতজন বাদ গেল। এরই মধ্যে বাদ পড়াদের অনেকে নিয়োগপত্র পেতেও শুরু করেছেন।
বিসিএসসহ সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের তথ্য আছে কি না, শুধু সেটা যাচাই করতে পারে পুলিশ। এ ক্ষেত্রে কোনো প্রার্থীর বা তাঁর পরিবারের কোনো সদস্যের রাজনৈতিক পরিচয় কী, তা যাচাই করে কোনো গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন দেওয়ার সুযোগ নেই।
ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন দমন করতে চাকরিপ্রার্থীদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা যাচাই শুরু হয়েছিল। সরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রে সেই ঔপনিবেশিক চর্চা এখনো চালু থাকা গ্রহণযোগ্য নয়। অতীতে রাজনৈতিক সরকারগুলো গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে যাচাই করে রাজনৈতিকভাবে ভিন্নমতের লোকদের চাকরি থেকে বঞ্চিত করেছিল। এই প্রক্রিয়ায় দলীয় লোক নিয়োগের মাধ্যমে প্রশাসন রাজনৈতিকীকরণ হয়েছিল। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ আমলে এই দলীয়করণ এতটাই প্রকট রূপ নিয়েছিল যে দলীয় সরকার ও আমলাতন্ত্রের মধ্যকার পার্থক্যরেখাটাই মুছে গিয়েছিল। জনপ্রশাসনে দলীয়করণের শুরুটাই হয় যাচাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। দলীয়করণের কারণেই আমাদের জনপ্রশাসন অদক্ষ ও বিশৃঙ্খল।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জনপ্রশাসন সংস্কারে গঠিত কমিটি সুপারিশ করেছিল, বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত নিয়োগের আগে পুলিশ বিভাগের কাছে শুধু সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা আছে কি না, সে সম্পর্কে প্রতিবেদন চাইবে। প্রয়োজনে মন্ত্রণালয় দুর্নীতি দমন কমিশনে প্রতিবেদন চাইতে পারে।
সরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রে এই সুপারিশ যৌক্তিক ও জন–আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও তা বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখা যায়নি। আমরা মনে করি, সরকারি চাকরিতে যাচাইয়ের নামে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগের অবসান হতে হবে।