গবেষণায় দেখা গেছে, বাজারে ধান-চালের ব্যবসায় মূলত পাঁচটি পক্ষ জড়িত। প্রথমত, কৃষক নিজে; দ্বিতীয়ত, ফড়িয়ারা; তৃতীয়ত, আড়তদারেরা; চতুর্থত, চালকলমালিকেরা ও পঞ্চমত, চালের খুচরা বিক্রেতারা। এর মধ্যে সবচেয়ে কম লাভ করেন ফড়িয়ারা। প্রতি কেজি ধানে ৫০ থেকে ৬৫ পয়সা। আড়তের মালিকেরা প্রতি কেজিতে ১ টাকা ৭৫ পয়সা পর্যন্ত মুনাফা করে থাকেন। তাঁদের খরচ বলতে দোকান ও গুদামের ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও শ্রমিক-কর্মচারীদের মজুরি।

ব্রির মহাপরিচালক শাহজাহান কবিরের মতে, মূলত চালকলের মালিকদের কারণে দাম দ্রুত বাড়ছে। ফলে চালকলগুলোর উচিত তারা কত দামে ধান কিনে তা কীভাবে চালে পরিণত করছে এবং ধান ও উপজাত বাবদ মোট কী পরিমাণ মুনাফা করছে, তার হিসাব দেওয়া। আর খাদ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত, চালকলের মালিকদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে চালের মিলগেট দাম কমানোর উদ্যোগ নেওয়া। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেছেন, আর্থিক, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান হওয়ায় চালকলের মালিকেরা চালের বাজারে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন।

প্রশ্ন হলো খাদ্য মন্ত্রণালয় কাজটি করবে কি না। এর আগে যখনই চালের দাম বেড়েছে, সরকার দু-একটি বাজারে অভিযান চালিয়ে কিছু মজুত চাল উদ্ধার করেই দায়িত্ব শেষ করেছে। কিন্তু মিলমালিকদের কারসাজির বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। এর আগে আমরা ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ ও চিনির বাজারে সিন্ডিকেটের কথা শুনে এসেছি। সরকারের নীতিনির্ধারকেরাও বলেছেন। এখন দেখা যাচ্ছে, চালের বাজারেই বড় সিন্ডিকেট। চালকলের মালিকেরা দাম বাড়িয়ে দিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি করেন, যাতে সরকার আমদানি করতে বাধ্য হয়। আবার আমদানির সিদ্ধান্ত হলে সেই সুযোগও তাঁরা হাতিয়ে নেন।

সরকারের মন্ত্রী ও সচিবেরা মাঝেমধ্যে চালের বাজারের কারসাজির কথা চালকলের মালিকদের বিরুদ্ধে বুলন্দ আওয়াজ তোলেন। কিন্তু এই চালকলমালিকেরা সম্ভবত জানেন যে কোন দেবতাকে কী নৈবেদ্য দিয়ে তুষ্ট করতে হয়। যাঁরা যখন ক্ষমতায় থাকেন, তাঁদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে অন্যায্য মুনাফা হাতিয়ে নেন। চালকলমালিকেরা ব্যবসা করবেন, তাই বলে প্রতি কেজি চালে ৮ থেকে ১৪ টাকা হাতিয়ে নেবেন, এটা হতে পারে না।

চালের বাজারের নৈরাজ্য বন্ধ করতে আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে চালকলের মালিকদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হলে সরকারকে দ্বিমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, কঠোর ও নিবিড় নজরদারি, যাতে কেউ অন্যায্য মুনাফা করতে না পারেন। দ্বিতীয়ত, নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চাল মজুত ও বিতরণ করা। প্রতিবেশী ভারতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় চালের একটা বড় অংশ বিতরণ করা হয়। ফলে সেখানে কোনো মিলমালিক বা ব্যবসায়ী প্রতি কেজি চালে এত বেশি মুনাফা করতে পারেন না।