দরিদ্র মানুষের জীবনে স্বস্তি ফেরাতে হবে

সম্পাদকীয়

টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেশের নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাপনে যে কত বড় সংকট তৈরি করেছে, তা টিসিবির ট্রাকের পেছনে ছুটতে গিয়ে রাস্তায় পড়ে যাওয়া নারীর ছবিই বড় উদাহরণ। রমজান মাসে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় এই সংকট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। রাজধানীর উত্তরা এলাকা থেকে মঙ্গলবার প্রথম আলোর আলোকচিত্রী দীপু মালাকারের তোলা ছবি ভাইরাল হয়। এই ছবি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির স্থবিরতা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে ভাটা এবং দারিদ্র্য বাড়ার চিত্রকেই তুলে ধরে। নতুন সরকারকে অবশ্যই সাধারণ মানুষের জীবনযাপনে স্বস্তি ফেরানোর পথ খুঁজে বের করতে হবে।

মূল্যস্ফীতিকে অর্থনীতির ভাষায় নীরব ঘাতক বলে। কেননা, মূল্যস্ফীতি মানুষের প্রকৃত আয় কমিয়ে দেয়। করোনা মহামারি, রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে এবং আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার কারণে দেশে টানা তিন বছরের বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও এখনো সেটা ৮–৯ শতাংশের ঘরে আটকে আছে। এ সময়ে মূল্যস্ফীতির তুলনায় বেতন ও মজুরি বাড়েনি। অন্যদিকে ব্যবসার পরিবেশের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের আস্থা তৈরি না হওয়ায় ব্যবসা–বিনিয়োগে স্থবিরতা বিরাজ করছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে দারিদ্র্য পরিস্থিতির ওপর।

আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিটি প্রতিবেদন জানাচ্ছে কয়েক দশক পর বাংলাদেশে দারিদ্র্যের আবার উল্টোযাত্রা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, বর্তমানে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৬০ লাখ। বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পিপিআরসির হিসাব বলছে, দেশে দারিদ্র্যের হার প্রায় ২৮ শতাংশ। এ রকম বাস্তবতায় নিম্ন আয়ের মানুষের কষ্ট লাঘব করতে হলে আরও বেশিসংখ্যক মানুষকে যেখানে সামাজিক সুরক্ষাবেষ্টনীর মধ্যে আনা প্রয়োজন ছিল, সেখানে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অনেক ক্ষেত্রে তার উল্টোটাই ঘটেছে। দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগে টিসিবির ফ্যামিলি কার্ড এক কোটি থেকে কমিয়ে ৬৬ লাখে নামিয়ে আনা হয়।

ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি মাঝেমধ্যে খোলাবাজারে পণ্য বিক্রি চালু রেখেছে টিসিবি। রমজান মাসে সারা দেশে ৫০টি জায়গায় ট্রাকে করে পণ্য বিক্রি করা হয়। প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, একজন ভোক্তা টিসিবি থেকে তেল, চিনি, ডালসহ নিত্যপণ্য কিনলে বাজার থেকে ৩৫০ টাকা সাশ্রয় হয়। বাস্তবতা হচ্ছে, চাহিদার তুলনায় টিসিবির পণ্য পর্যাপ্ত নয়। ফলে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও পণ্য না পেয়ে অনেককে খালি হাতে ফিরতে হয়। এ কারণেই ট্রাকের পেছনে হুড়োহুড়ি এবং ছুটতে থাকা মানুষের ভিড়ের মতো করুণ চিত্রের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

নতুন সরকারের সামনে সামষ্টিক অর্থনীতিতে গতি ফেরানো এবং ব্যবসা ও বিনিয়োগে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করার বড় দায়িত্ব এসে পড়েছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার চাপ কমাতে হলে মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার বিকল্প নেই। মুদ্রানীতি, রাজস্ব নীতির সঙ্গে সরবরাহ ব্যবস্থাপনাও ঠিক করতে হবে। অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ও পণ্য পরিবহনে চাঁদাবাজি দেশে পণ্যের দাম বাড়ার বড় দুটি কারণ। সরকারকে অবশ্যই বাজার তদারকি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে তুলতে হবে।

রমজান মাসে চাহিদার বিপরীতে খোলাবাজারে টিসিবির পণ্য বিক্রি বাড়ানো প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপি চার কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মাধ্যমে পরিবারগুলোর কাছে আড়াই হাজার টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপণ্য দেওয়া হবে। আগামী ১০ মার্চ ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের উদ্বোধন হওয়ার কথা। আমরা মনে করি, বর্তমান বাস্তবতায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতমুক্ত থেকে দরিদ্র পরিবারগুলোকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা প্রয়োজন।