একজন শিক্ষক নিয়ে এ কেমন নার্সিং শিক্ষা!

সম্পাদকীয়

বিশাল চারতলা একাডেমিক ভবন, পাঁচতলা হোস্টেল ও আধুনিক বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩৫ কোটি টাকা। কিন্তু উদ্বোধনের প্রায় তিন বছর অতিক্রান্ত হতে চললেও শরীয়তপুরের ডামুড্যা আলহাজ আব্দুর রাজ্জাক নার্সিং কলেজে আজ পর্যন্ত কোনো জনবলকাঠামো অনুমোদন পায়নি। চার শিক্ষাবর্ষের ২০০ জন শিক্ষার্থীকে পাঠদান করছেন অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে সংযুক্তিতে আসামাত্র একজন প্রশিক্ষক! শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটিই এখন করুণ বাস্তবতা নার্সিং কলেজটির। বিষয়টি খুবই হতাশাজনক।

চিকিৎসা খাতে আবশ্যকীয় একটি পদ হচ্ছে নার্সিং। এ পদে জনবলসংকট নতুন নয়। সেই সংকট কাটানো ছাড়াও নার্সিং পেশায় উৎকর্ষ সাধনের জন্য দেশে অনেক নার্সিং কলেজ গড়ে তোলা হয়েছে, এগুলোর আধুনিকায়নও করা হয়েছে। তার একটি হচ্ছে শরীয়তপুরের এই নার্সিং কলেজ। নার্সিং শিক্ষায় ব্যবহারিক ল্যাব ও লাইব্রেরি হলো মূল মেরুদণ্ড। অথচ এই কলেজে তৈরি করা সাতটি গবেষণাগারের (ল্যাব) একটিও আজ পর্যন্ত চালু করা হয়নি। লাইব্রেরিতে নেই কোনো পাঠ্যবই; উল্টো সেই কক্ষসহ কলেজের ছয়টি রুমে ফেলে রাখা হয়েছে নির্বাচন কার্যালয়ের ইভিএম। পর্যাপ্ত শিক্ষক ও ল্যাবের অভাবে শিক্ষার্থীরা তাঁদের প্রাপ্য শিক্ষার ২০ শতাংশও পাচ্ছেন না। সনদ হয়তো শিক্ষার্থীরা দিন শেষে ঠিকই পাবেন, কিন্তু উপযুক্ত ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ছাড়া কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করা এসব নার্স রোগীদের কতটুকু সেবা দিতে পারবেন, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। শুধু শিক্ষাই নয়; প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ‘অর্থনৈতিক কোড’ না থাকায় শিক্ষার্থীরা পাওনা সরকারি উপবৃত্তি থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন, যা সাধারণ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের আর্থিক চাপে ফেলছে।

নার্সিংয়ের মতো প্র্যাকটিক্যালনির্ভর চিকিৎসাবিদ্যায় এ ধরনের অপেশাদারি ও অবকাঠামোসর্বস্ব মানসিকতা কেবল হতাশাজনকই নয়, দেশের স্বাস্থ্য খাতের ভবিষ্যতের জন্যও মারাত্মক হুমকি। পরিকল্পনাহীনভাবে বিপুল অঙ্কের সরকারি অর্থ ব্যয় করে দালানকোঠা বানানো এবং লোকদেখানো উদ্বোধন করার সংস্কৃতি নতুন নয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় শিক্ষক ও সরঞ্জাম ছাড়া শিক্ষার্থী ভর্তি করিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় ঠেলে দেওয়া চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। তিন বছর ধরে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরে চিঠি চালাচালি করেও শিক্ষক পদায়ন বা ল্যাব চালু না হওয়া আমলাতান্ত্রিক লালফিতার দৌরাত্ম্যকেই স্পষ্ট করে।

কেবল ইট-পাথরের ভবন সাজিয়ে মানসম্মত স্বাস্থ্যশিক্ষা নিশ্চিত করা যায় না। ডামুড্যা নার্সিং কলেজের জনবলকাঠামো অবিলম্বে অনুমোদন করে স্থায়ী শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিতে হবে। পাশাপাশি সাতটি ল্যাব কার্যকর করা, ইভিএম সরিয়ে লাইব্রেরিতে বই সরবরাহ করা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য দ্রুত উপবৃত্তি চালুর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কোটি কোটি টাকার ভবন যেন জনবলের অভাবে পড়ে থেকে অবহেলার স্মারক হয়ে না থাকে, সরকারকে তা নিশ্চিত করতে হবে।