চাপের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করা প্রয়োজন

সম্পাদকীয়

ময়মনসিংহের ভালুকায় ৪৫ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য জমি নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিষয়টি শুধু একটি বিদ্যুৎ প্রকল্পের জমি নির্বাচন নয়; এর সঙ্গে কৃষিজমি রক্ষা এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতার প্রশ্নও জড়িত। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, একজন সংসদ সদস্য তাঁর ক্ষমতা বা রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করেছেন কি না।

প্রকল্পটির উদ্যোক্তা ভাওয়াল ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। কোম্পানির চেয়ারম্যান তাসলিমা আক্তার। তিনি ভালুকার সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিন আহমেদের স্ত্রী। স্থানীয় মানুষের কাছে প্রতিষ্ঠানটি এমপির মালিকানাধীন কোম্পানি হিসেবে পরিচিত। এমন পরিস্থিতিতে প্রকল্পটির প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি ছিল। কিন্তু শুরুতেই দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। কৃষি বিভাগ প্রথমে জমিকে কৃষিজমি উল্লেখ করে আপত্তি জানিয়েছিল। পরে সেই বিভাগই অনাপত্তিপত্র দিয়েছে। এর পেছনে চাপের অভিযোগ উঠেছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নুসরাত জামান বলেছেন, পুরো জমিকে অকৃষি দেখিয়ে প্রত্যয়ন দিতে তাঁর ওপর চাপ ছিল। উন্নয়নমূলক কাজ ও বিদ্যুতের সমস্যার কথা বলে তাঁকে অনাপত্তি দিতে বলা হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত তাঁকে অনাপত্তি দিতে হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, একজন সংসদ সদস্য কি তাঁর পদ বা রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে নিজের পরিবারের ব্যবসায়িক স্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি প্রকল্পে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেছেন? অভিযোগটি সত্য কি না, তা তদন্ত হওয়া দরকার। এমপি ফখর উদ্দিন আহমেদ অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

লক্ষণীয় হলো, ২৩ জুলাইয়ের যাচাই কমিটির প্রতিবেদনে ১৬৭ দশমিক ৮৪ একর জমির মধ্যে ৬৩ একরকে এক ফসলি বলা হয়েছিল। এসব জমিতে বোরো ধান হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, স্থাপনা নির্মিত হলে ধানের উৎপাদন কমবে। কিন্তু এক মাসের মধ্যে, ১৯ আগস্ট দেওয়া অনাপত্তিপত্রে চিত্র বদলে যায়। সেখানে ১৭৩ দশমিক ১৩ একর জমির মধ্যে ১৪১ দশমিক ৯৭ একরকে অকৃষি এবং মাত্র ৩১ দশমিক ১৬ একরকে এক ফসলি বলা হয়। প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তন কীভাবে হলো? জমির প্রকৃতি কি এক মাসের মধ্যে বদলে গেল, নাকি মূল্যায়নের পদ্ধতিতে পরিবর্তন এসেছে?

কৃষি কর্মকর্তা আরও বলেছেন, পরে কিছু দাগ পরিবর্তন করা হলেও মাঠপর্যায়ে তা যাচাই করার সুযোগ তিনি পাননি। শুধু কাগজপত্র দেখে অনাপত্তি দেওয়া হয়েছে। ইউএনওর বক্তব্য অবশ্য ভিন্ন। তিনি বলেছেন, এক ফসলি ও মাছ চাষের জমি বাদ দিতে আবেদনকারীকে বলা হয়েছিল। পরে সংশোধিত শিডিউলে প্রায় ২০ একর জমি বাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, অনাপত্তি দেওয়ার জন্য কোনো চাপ ছিল না।

একই বিষয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের এমন পরস্পরবিরোধী বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। তাই পুরো বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা দরকার। প্রশাসন যদি রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার করে, তাহলে কৃষিজমি রক্ষার আইন শুধু কাগজ–কলমেই থেকে যাবে, বাস্তবে কোনো কাজ হবে না।