বালুমহাল ইজারা দেওয়ার সুযোগ নেই

সম্পাদকীয়

রাজশাহীর বাঘা উপজেলার হাজারো কৃষকের জীবনে পদ্মা নদী ছিল দীর্ঘ ৪০ বছরের এক হাহাকারের নাম। নদীভাঙনে ভিটেমাটি ও ফসলি জমি হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া মানুষগুলো কেউ পাড়ি জমিয়েছিলেন ঢাকার পোশাক কারখানায়, কেউবা বেছে নিয়েছিলেন দিনমজুরি। কিন্তু গত কয়েক বছরে সরকারি নদী খনন ও বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের সুফলে সেই হারানো জমি আবার জেগে উঠেছে। ধু ধু বালুচর এখন বাদাম, বোরো ধান আর গমের সবুজ হাসিতে মুখর। এখন সেই জমি বালু সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

৩০০ হেক্টর জমিতে প্রাণের স্পন্দন ফিরে আসা কেবল কৃষির সাফল্য নয়, এটি হাজারো পরিবারে সচ্ছলতা তৈরির তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, যখন এই জনপদে সুদিন ফিরতে শুরু করেছে, তখনই নতুন করে মেঘ জমছে আশঙ্কার আকাশে। পাউবোর নদী রক্ষা প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার অজুহাতে জেলা প্রশাসন আবারও বালুমহাল ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। অতীতে এই এলাকাতেই নির্বিচার বালু তোলার ফলে নদীভাঙন তীব্র হয়েছিল এবং সাজানো মাঠ নদীতে বিলীন হয়ে গিয়েছিল। জেলা প্রশাসকের কাছে কৃষকদের আকুতি, আবার যেন তাঁদের জীবন ও জীবিকা অনিশ্চিয়তার মুখে ঠেলে না দেওয়া হয়।

পাউবোর প্রকৌশলীরা বলছেন, তাঁদের কাজ শেষ, তাই ইজারা দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রকৌশলগত মাপকাঠিতে কাজ শেষ হলেও পরিবেশগত ও মানবিক মাপকাঠিতে কি তার প্রভাব খতিয়ে দেখা হয়েছে? ড্রেজার দিয়ে বালু তোলা শুরু হলে নদীর তলদেশের গতিপথ পরিবর্তিত হবে এবং চরের নরম পলিমাটি ধসে পড়া কেবল সময়ের ব্যাপার। যে ৭৪০ কোটি টাকার প্রকল্পে নদী রক্ষা করা হয়েছে, সেই রক্ষাকবচ কি সামান্য কিছু রাজস্বের লোভে ভেঙে ফেলা হবে? বালুমহাল থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব কি হাজারো কৃষকের ফসলের মূল্য আর তাঁদের অস্তিত্বের চেয়েও দামি?

বাঘার কৃষকেরা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, বালু তোলা শুরু হলে তাঁদের আবারও পরদেশে দিনমজুরি করতে যেতে হবে। রাজশাহী জেলা প্রশাসনের উচিত হবে কেবল এসি ল্যান্ড বা ইউএনওর টেবিল রিপোর্টের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি কৃষকদের কাছে যাওয়া এবং বালুমহাল ইজারা দেওয়া হলে যে কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, তা অনুধাবন করা।

উন্নয়ন হতে হবে টেকসই ও জনমুখী। যে উন্নয়ন হাজারো মানুষকে পুনরায় নিঃস্ব করে দেয়, তা আদতে কোনো উন্নয়ন নয়। আমরা আশা করব, রাজশাহী জেলা প্রশাসন বালুমহাল ইজারার হঠকারী সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে। ফসলের সবুজ মাঠ আর কৃষকের জীবনকে বাজি রেখে কোনো বালুদস্যু বা ইজারাদারকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না—এটিই আমাদের প্রত্যাশা। তা ছাড়া বাঁধের সুরক্ষা হুমকির মুখে ফেলার কোনো সুযোগ নেই।