ব্যবসায়ীরা নিরুপায় হয়ে গত বুধবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করে শিল্পকারখানায় গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। ব্যবসায়ীরা যেদিন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন, সেদিনই গণমাধ্যমে গাজীপুরসহ অনেক এলাকার শিল্পকারখানার ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ-গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকার খবর এসেছে।

ব্যবসায়ীরা বেশি দাম দিয়েও গ্যাস-বিদ্যুৎ নিতে প্রস্তুত আছেন বলে জানান। বিদ্যুতের ঘাটতি থাকায় মানুষ কৃচ্ছ্রসাধন করতে রাজি এবং করছেনও। কিন্তু শিল্পকারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকলে উৎপাদন কম হবে। উৎপাদন কম হলে রপ্তানিমুখী পণ্য বিদেশি বাজার হারাবে। আর দেশীয় বাজারেও পণ্যের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে। অতএব, ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ অমূলক নয়। উৎপাদন বন্ধ থাকলে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে শ্রমিকদের ওপরেও। আমরা চাই না কোনো শ্রমিক তাঁর কর্ম হারান, কোনো শ্রমিকের বেতন–ভাতা বন্ধ হয়ে যাক।

সরকারের নীতিনির্ধারকেরা বলেছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণেই পরিস্থিতি নাজুক হয়েছে। কিন্তু সেটাই একমাত্র কারণ নয়। বিশেষ করে বিদ্যুৎ-গ্যাসের ক্ষেত্রে সরকারের পরনির্ভরশীল নীতি আমাদের আরও নাজুক অবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে। গত ১৩ বছরে সরকার দেশীয় সম্পদ গ্যাস অনুসন্ধান ও আহরণের চেষ্টা করেনি। এমনকি ভোলায় গ্যাস পেয়েও তা পুরোটা ব্যবহার করা যাচ্ছে না সরবরাহব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে।

প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করেছেন যে গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে কোনো কারখানা বন্ধ থাকবে না। কিন্তু কোনো কারখানায় দিনে ছয়-সাত  ঘণ্টা গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকলেও যে ক্ষতি হবে, তা কাটিয়ে ওঠা সহজ হবে না। প্রধানমন্ত্রী কষ্টে থাকা জনগণের কথা ভাবার জন্য ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর এ মানবিক আহ্বানের প্রতি সমর্থন জানিয়েও যে প্রশ্নটি করা প্রয়োজন, তা হলো ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা কতটা জনগণের কথা ভাবেন? প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, হাওয়া ভবন নেই। কিন্তু ব্যবসায়ীদের এখনো ব্যবসা করতে গেলে চাঁদাবাজির শিকার হতে হয়, সরকারি কোনো দেনদরবারে ঘুষ দিতে হয়। এই বাস্তবতা অস্বীকার করে সমস্যার সমাধান মিলবে না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তো আছেই। 

করোনাকালে কৃষি ও প্রবাসী আয় আমাদের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখেছিল। প্রবাসী আয় ও রপ্তানি কমার প্রেক্ষাপটে কৃষিই একমাত্র ভরসা। কৃষি যন্ত্রপাতি আমদানি ও কৃষির উপাদান সার, বীজ, সেচ ইত্যাদিতে সরকারের সহায়তা অব্যাহত রাখার বিকল্প নেই। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী যেসব নির্দেশনা দিয়েছেন, তা দ্রুত কার্যকর হবে আশা করি।

সবশেষে বলব, জ্বালানির বিষয়ে একটা ধোঁয়াশা আছে। কবে নাগাদ সংকট কাটবে, তার চেয়েও সংকট মোকাবিলায় সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা দেশবাসীর জানা প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, সমস্যাটি এতই গুরুতর যে উত্তরণে টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ প্রয়োজন। বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত পদক্ষেপ সংকট উত্তরণে সহায়ক হবে না।