ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আপিল শুনানি শেষ হয়েছে গত রোববার। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন আগামীকাল বুধবার। বৃহস্পতিবার চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ ও প্রতীক বরাদ্দের পর প্রার্থীরা আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু করতে পারবেন। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, ভোটারদের কেন্দ্রমুখী করার ক্ষেত্রে প্রচারণাপর্বটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টি ও সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ তৈরি করাটাই নির্বাচন কমিশন ও অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে আমরা মনে করি।
উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতিতে অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশন এখন পর্যন্ত সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানি ও অপপ্রচার, মব সহিংসতা, লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে হত্যাসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এমনিতেই জননিরাপত্তায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা নানা সময়ে সতর্ক করে আসছিলেন, অবৈধ অস্ত্র ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া গেলে নির্বাচনের পরিবেশের ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে। এর সঙ্গে সীমান্তে অবৈধ পারাপার, জাল টাকার কারবার ও অস্ত্র চোরাচালানও নির্বাচনকেন্দ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, সম্প্রতি সরকারের আইনশৃঙ্খলা–সংক্রান্ত সভায় সীমান্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এরপর দেশের সীমান্তবর্তী ২৭ জেলার পুলিশকে বিশেষ নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়, বিজিবিকেও সতর্ক থাকার কথা বলা হয়। আমরা মনে করি, পুলিশ ও বিজিবিকে নির্দেশ দেওয়াটাই যথেষ্ট নয়, যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নিয়মিত তদারক করতে হবে।
তফসিল ঘোষণার এক দিন পর ঢাকা–৮ আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড এবং হত্যাকারীদের সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। পুলিশের তালিকায় ২৭ জেলায় ৭৮৭ ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে, যাঁরা নিয়মিতভাবে টাকার বিনিময়ে সীমান্ত পারাপারে সহায়তা করেন। লাইনম্যান হিসেবে পরিচিত এই ব্যক্তিদের বেশির ভাগই স্থানীয় বাসিন্দা। তাঁদের দুর্গম পথ, নদী ও চর এবং পাহাড়ি ট্রেইল সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা আছে। সীমান্তে অবৈধ পারাপারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অবশ্যই নজরদারি ও আইনের আওতায় আনতে হবে।
ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে হত্যাকাণ্ডগুলো পরিষ্কার ইঙ্গিত দিচ্ছে যে অবৈধ অস্ত্র জননিরাপত্তার ক্ষেত্রে কতটা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সুযোগে থানা, ফাঁড়ি, কারাগার থেকে বিপুলসংখ্যক অস্ত্র ও গোলাবারুদ খোয়া যায়। কারাগার থেকে অনেক চিহ্নিত সন্ত্রাসী বেরিয়ে যায়। খোয়া যাওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদের একটা অংশ সন্ত্রাসীদের কাছে গেছে বলেই আশঙ্কা করেছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা। এর সঙ্গে সীমান্ত দিয়ে দেশে অবৈধ অস্ত্র ও গুলি ঢুকেছে, গত কয়েক মাসে কুষ্টিয়া, কুমিল্লাসহ কয়েকটি জায়গায় অস্ত্র উদ্ধারই তার বড় প্রমাণ। আশঙ্কাজনক বিষয় হচ্ছে, বিভিন্ন পথে দেশে অপ্রচলিত অস্ত্র এসেছে, যা নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পেছনে অবৈধ অস্ত্রের বড় ভূমিকা থাকলেও এখন পর্যন্ত অস্ত্র উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাফল্য বলার মতো নয়। আমরা মনে করি, ভয়হীন ও উৎসবমুখর নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টি করতে হলে চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের আর কোনো বিকল্প নেই।
চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ও প্রতীক বরাদ্দ হওয়ার পর প্রার্থীরা যাতে নির্বিঘ্নে ও সমান সুযোগ নিয়ে প্রচার–প্রচারণা চালাতে পারেন, সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশন ও সরকারের। সুষ্ঠু নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য শুধু ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতই যথেষ্ট নয়, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণও জরুরি। সীমান্ত দিয়ে যাতে কোনোভাবেই অবৈধ অস্ত্র প্রবেশ করতে না পারে এবং অপরাধীরা যাতে অপরাধ করে সীমান্ত পেরিয়ে না যেতে পারে, তার জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা জরুরি।