দায়িত্বশীল আচরণের বিকল্প নেই

বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা নেওয়া এবং প্রশ্নপত্র নিয়ে এইচএসএসি পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। এর ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার ঢাকা, চট্টগ্রামসহ ১৩টি জেলায় শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, শিক্ষা বোর্ড ঘেরাও ও সমাবেশ করেন। ঢাকায় সংসদ ভবনের সামনের সড়ক থেকে শিক্ষার্থীদের লাঠিপেটা করে সরিয়ে দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের এই বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ঢাকার সড়কগুলোতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়, দিনভর ভোগান্তিতে পড়েন নাগরিকেরা। বনিয়াদি শিক্ষার সর্বশেষ স্তর থেকে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ এই পরীক্ষা চলাকালে এ রকম অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি কোনোভাবেই কাম্য নয়।

বঙ্গোপসাগরের লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর কারণে গত সোমবার পর্যন্ত দেশজুড়ে ভারী ও অতিভারী বৃষ্টি হয়েছে। ফলে চট্টগ্রাম অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। চট্টগ্রাম মহানগর ও ঢাকায় জলাবদ্ধতার কারণে নাগরিক ভোগান্তি চরমে ওঠে। বন্যা ও জলাবদ্ধতা বিবেচনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড ওই অঞ্চলের মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের একাধিক পরীক্ষা স্থগিত করে। কিন্তু অন্যান্য বোর্ডে পরীক্ষা বহাল রাখে। এ সিদ্ধান্ত যথাযথ হয়নি বলে আমার মনে করি। কেননা কুমিল্লাসহ অনেক জায়গায় সেদিনও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া অব্যাহত ছিল, অনেক শিক্ষার্থীকে দুর্ভোগ ভোগ করেই পরীক্ষা দিতে হয়েছে। অনেকেই সঠিকভাবে পরীক্ষা দিতে পারেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। 

এ পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হওয়াটা স্বাভাবিক। অন্যদিকে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের একটি অযাচিত মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। সরকারের একজন মন্ত্রীর কাছ থেকে এ রকম মন্তব্য মোটেই প্রত্যাশিত নয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে শিক্ষামন্ত্রী তাঁর বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন; কিন্তু সেটি যদি শুরুতেই করা যেত, তাহলে ঘটনা এত দূর গড়াতে পারত না।

আমরা দেখেছি, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশের শিক্ষাঙ্গনগুলো অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছিল। বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীরা নানা দাবি নিয়ে সড়ক অবরোধ করায় নাগরিক ভোগান্তি নিয়মিত বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। শিক্ষার্থীদের সংকটগুলো সমাধানে দায়িত্বশীলতা ও সংবেদনশীলতার ঘাটতির কারণেই সেটা হয়েছিল। নির্বাচিত সরকারের কোনো কর্তাব্যক্তির অযাচিত আচরণ, মন্তব্যে যদি সেই একই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, সেটা যারপরনাই দুঃখজনক। সরকারকে অবশ্যই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্বেগ ও অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।

পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্র পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে ভুল প্রশ্নের জন্য চার শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় ভুল প্রশ্ন থাকার বিষয়টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে যেসব শিক্ষার্থী সোমবারের পরীক্ষা দিতে পারেননি, তাঁরা আবারও পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাবেন। এ ছাড়া পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রে যে দুটি প্রশ্ন ভুল ছিল, সে দুটিতে পূর্ণ নম্বর দেওয়া হবে। 

তবে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ যেসব দাবিদাওয়া করেছেন, তার কয়েকটি কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বিশেষ করে প্রশ্নপত্র কেমন হওয়া উচিত, এটা ঠিক করার দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের নয়। আমরা মনে করি, শিক্ষার মানের প্রশ্নে কোনো আপস করা যাবে না। কেননা এর সঙ্গে আমাদের আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যতের প্রশ্নটি জড়িয়ে রয়েছে।

গতকাল বুধবার পরীক্ষা শেষ করে ঢাকায় কিছু শিক্ষার্থীকে বিক্ষোভ করতে দেখা গেছে। আমরা আশা করি, শিক্ষার্থী ও সরকারের মধ্যে দ্রুতই ভুল–বোঝাবুঝির অবসান হবে। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মনোনিবেশ করবেন ও বাকি পরীক্ষাগুলো নির্বিঘ্নে শেষ হবে। সর্বোপরি, সরকারকে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে।