অংশীজনদের শঙ্কা ও উদ্বেগ নিরসন করুন

সম্পাদকীয়

প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইন–২০২৬ নিয়ে অংশীজনদের মধ্যে শঙ্কা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গণমাধ্যম-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন, খসড়ায় এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলোর অপপ্রয়োগের আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআইবি) উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছে, খসড়ায় এমন কিছু বিধান যুক্ত করা হয়েছে, যা জনগণের মৌলিক মানবাধিকার ও বাক্‌স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ব্যাপক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে আওয়ামী লীগের যে কর্তৃত্ববাদী শাসন, তার অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল ২০০৬ সালের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের ৫৭ ধারা এবং এর ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালে পাস হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। সাইবার পরিসরে নাগরিক সুরক্ষায় এই আইন পাস করা হলেও এর কিছু বিতর্কিত ধারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাগরিকদের মতপ্রকাশের অধিকার হরণ, বিরোধী মত ও ভিন্নমতাবলম্বী দমন এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ ও নিয়ন্ত্রণে এর যথেচ্ছ ব্যবহার হয়েছে। মানহানিকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা, অজামিনযোগ্য ধারাসমূহ ও কঠোর শাস্তির কারণে যে ব্যাপক অপপ্রয়োগ ঘটেছে, তার কারণে বৈশ্বিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে বিশ্বের অন্যতম ড্রাকুনিয়ান বা দমনমূলক আইন হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।

দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থা, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের সমালোচনার মুখে তৎকালীন সরকার ২০২৩ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করে সাইবার নিরাপত্তা আইন পাস করলেও আগের আইনের মৌলিক কাঠামো অক্ষুণ্ন রাখা হয়েছিল। ফলে মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের অধিকারের প্রশ্নে এটি কার্যত ‘কালো আইন’ হিসেবেই থেকে যায়। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার আগের সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল করে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ পাস করেছিল। এই অধ্যাদেশ আগের আইনের চেয়ে তুলনামূলক ভালো হলেও অস্পষ্ট সংজ্ঞা থাকায় কিছু ক্ষেত্রে মতপ্রকাশকে ‘অপরাধ’ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ রয়ে যায়। একই সঙ্গে কঠোর শাস্তির বিধান মতপ্রকাশকে নিরুৎসাহিত করতে পারে বলে শঙ্কা তৈরি হয়।

বিএনপি সরকার গঠনের পর সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত করলেও এটি সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে সংশোধনীর খসড়ায় বাতিল হওয়া বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের গণমাধ্যমবিরোধী কিছু বিষয়বস্তুও যুক্ত করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সরকারের উদ্যোগে একটি পরামর্শ সভায় গণমাধ্যম–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে খসড়া অনুযায়ী আইনটি পাস হলে অতীতের মতো গণমাধ্যম ভুক্তভোগী হতে পারে।

প্রস্তাবিত আইনের ২৫ নম্বর ধারায় যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেলিং, রিভেঞ্জ পর্ন, ডিজিটাল শিশু যৌন নিপীড়নের মতো কঠিন অপরাধের সঙ্গে মানহানি বা হেয়প্রতিপন্নের মতো বিষয়কেও যুক্ত করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে শাস্তি। আইনের ৮(২) ধারায় রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর ধারা যুক্ত করা হয়েছে। এই ধারাও সাংবাদিকদের জন্য বিপদের কারণ হতে পারে। এতে করে আগের মতোই এই আইনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে নাগরিক নিপীড়ন ও গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার সুযোগ তৈরি হবে।

প্রস্তাবিত আইনে সাইবার অপরাধ, সাইবার সুরক্ষা ও জনগণের মতপ্রকাশের অধিকার-সম্পর্কিত তিনটি জটিল বিষয় একটি আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে তিনটির কোনোটিতেই যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। খসড়া আইনটিতে গুজব, বিভ্রান্তিকর তথ্য, অপতথ্য, হেয়প্রতিপন্ন, মানহানিকর, রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকরসহ বেশ কিছু ধারণাকে এমনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, যার ফলে ইচ্ছাকৃতভাবে অপব্যাখ্যার মাধ্যমে অপব্যবহারের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

আমরা মনে করি, চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থান যে জন–আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছে, সেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয়, এমন কোনো আইন ফিরতে পারে না। অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করেই খসড়াটির ক্ষেত্রে যেসব উদ্বেগ ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তার সমাধান করতে হবে। একই সঙ্গে আইনটি সংশোধনের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকে আলাদা রাখা অথবা গণমাধ্যমের জন্য রক্ষাকবচ রাখার যে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।