দেশব্যাপী করোনা সংক্রমণ দ্রুত বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে সরকার পাঁচ দফা বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। সরকারের কোনো কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠেছে, তার চেয়ে বেশি শঙ্কা দেখা দিয়েছে এর বাস্তবায়ন নিয়ে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ঘোষিত পাঁচ দফা বিধিনিষেধের প্রথম দফায় আছে, ২১ জানুয়ারি থেকে আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সব স্কুল-কলেজ ও সমপর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা; যা ইতিমধ্যে কার্যকর হয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছে। অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় খোলা রাখা না রাখার বিষয়টি নিজ নিজ কর্তৃপক্ষের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
সরকারের এ ঘোষণার আগেই বুয়েট, জাহাঙ্গীরনগরসহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইন পাঠদান কার্যক্রম শুরু করেছে। আশা করা যায়, অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ও তাদের অনুসরণ করবে। সে ক্ষেত্রে সরকারের প্রথম দফা বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে কোনো বেগ পেতে হবে না; যদিও সবকিছু খোলা রেখে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দুই সপ্তাহের জন্য বন্ধ রাখা নিয়ে অনেকে সমালোচনা করেছেন। সরকারের যুক্তি হলো বেশ কিছু স্থানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী আক্রান্ত হয়েছেন। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সাময়িক বন্ধ করা ছাড়া উপায় ছিল না। যেখানে অনলাইনে ক্লাস করার সুযোগ আছে, সেখানে সেটা চলবে। করোনা সংক্রমণ শুরু হয়েছে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে। মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছিল, যা প্রায় ১৮ মাস স্থায়ী ছিল। আমাদের প্রশ্ন হলো এই দীর্ঘ সময়েও কেন অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে অনলাইন পাঠক্রমের আওতায় আনা গেল না?
সরকারের বাকি চার দফা বিধিনিষেধ বাস্তবায়ন করা নিয়ে জনমনে যে প্রশ্ন, তা অযৌক্তিক নয়। করোনা মোকাবিলায় প্রধান হাতিয়ার টিকাদান ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। দুটিতেই আমরা পিছিয়ে আছি। সরকারি হিসাবেও অর্ধেক মানুষ এখনো দুই ডোজ টিকা পাননি। সরকারের কাছে প্রচুর টিকা মজুত আছে, দেশবাসী এ আশ্বাস শুনতে চায় না। তারা দেখতে চায় সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৮০ শতাংশ মানুষকে দুই ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে।
সরকারি বিধিনিষেধে সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে ১০০ জনের বেশি জনসমাবেশ না করা এবং প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীকে টিকা সনদ ও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পিসিআর সার্টিফিকেট নিয়ে আসার যে নির্দেশনা রয়েছে, তা আদৌ মানা হচ্ছে কি না, কে তদারক করবে? এর আগে ১১ দফা নির্দেশনায়ও হোটেল, রেস্তোরাঁ ও গণপরিবহনে টিকা সনদ নিয়ে যাওয়ার যে নির্দেশনা জারি করা হয়েছিল, তা-ও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মানা হয়নি। সরকারি নির্দেশনায় বাজার, শপিং মল, মসজিদ, বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাট, রেলস্টেশনসহ সব ধরনের জনসমাবেশে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহারসহ যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। কারিগরি কমিটি বিনা মূল্যে মাস্ক দেওয়ার যে পরামর্শ দিয়েছিল, সরকার তা আমলে নেয়নি। গরিব ও প্রান্তিক মানুষের পক্ষে প্রতিদিন মাস্ক কিনে ব্যবহার করা সম্ভব নয়। এ ব্যাপারে সরকারের সহায়তা আবশ্যক।
সরকার আরোপিত বিধিনিষেধ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হলে সংক্রমণ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। কিন্তু বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে কেবল স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর নির্ভর করলে হবে না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও তরুণ সমাজকে সম্পৃক্ত করতে হবে। সর্বস্তরের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া করোনা সংক্রমণের মতো জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা করা কঠিন বলেই মনে করি।