করোনাকালে ডেঙ্গুর আশঙ্কা

সারা দেশে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ফলে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার সব তৎপরতা এখন এই মহামারিকে কেন্দ্র করে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে চলে এসেছে আরেকটি সংক্রামক রোগ ডেঙ্গু জ্বরের মৌসুম। গত বছর বাংলাদেশে এ রোগ প্রায় মহামারি আকার ধারণ করেছিল। সরকারি হিসাবেই আক্রান্ত হয়েছিল ১ লাখ ৩৭৪ জন। মৃত্যু ঘটেছিল ১৭৯ জনের। মৃত্যুর এই হিসাব ছিল সরকারি সূত্রের। বেসরকারি হিসাবে সংবাদমাধ্যমে প্রায় ৩০০ ব্যক্তির মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়েছিল।

ডেঙ্গুর মৌসুম ধরা হয় এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়কে। অবশ্য এ সময়ের বাইরেও বছরের যেকোনো সময়েই মানুষ এই জ্বরে আক্রান্ত হতে পারে এবং হয়ও। গত বছর জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে আক্রান্ত হয়েছিল ৭৩ জন। কিন্তু চলতি বছর একই সময়ে আক্রান্ত হয়েছে ২৬৫ জন। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এ বছর ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা চার গুণ বেশি লক্ষ করা গেছে মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই। মার্চ মাসেই ডেঙ্গু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এ বছরের ডেঙ্গুর ভরা মৌসুমে এ রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি হবে। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ও এডিস মশার ঘনত্ব পর্যবেক্ষণ করে বলেছেন, আগামী জুলাই-আগস্ট মাসে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা অনেক বেড়ে যেতে পারে।

কিন্তু এটা অনিবার্য নয়। কারণ, বিষয়টি এমন নয় যে ডেঙ্গু জ্বরের বিস্তার রোধ করার কোনো উপায় আমাদের হাতে নেই। বরং উপায় আছে বলেই বিশেষজ্ঞরা মৌসুম শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই এ বিষয়ে সতর্ক করে আসছিলেন। অর্থাৎ ডেঙ্গুর প্রকোপ রোধ করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো নেওয়ার তাগিদ দিয়ে আসছিলেন।

ডেঙ্গুর জীবাণু করোনাভাইরাসের মতো মানুষের সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায় না; ছড়ায় ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে। সে কারণে এডিস মশার বিস্তার রোধ করার ওপরেই সব সময় সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

 গত বছর ডেঙ্গু জ্বরের ব্যাপক প্রকোপের কারণগুলো খতিয়ে দেখতে হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের গাফিলতি ছিল ডেঙ্গুর প্রকোপ এত বেশি হওয়ার আংশিক কারণ। দুর্ভাগ্যের বিষয়, তাদের সেই গাফিলতি এ বছরও দূর হয়নি। তাদের মশা নিধন কার্যক্রম যেন ঢিমেতেতালা এক মৌসুমি কাজ। মশার উপদ্রবে নগরবাসীর জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠলেও তাদের টনক নড়ে না। গত বছর ডেঙ্গু জ্বরে অনেক মানুষের মৃত্যু হলে যখন প্রচণ্ড শোরগোল উঠেছিল, তখনই কেবল তাদের টনক কিছুটা নড়েছিল। কিন্তু ডেঙ্গুর মৌসুম শেষ হলেই তাদের মশা নিধন কার্যক্রমে শিথিলতা দেখা দেয়।

এ কাজে তাদের অব্যবস্থাপনা-অনিয়মের অভিযোগও অনেক পুরোনো। মশার লার্ভা মারার ওষুধের অকার্যকারিতা, ওষুধ ছিটানোর যন্ত্র নিম্নমানের বলে অচিরেই নষ্ট হয়ে যাওয়া—এসব অভিযোগের প্রতিকার হয়নি। দেশের পুরো চিকিৎসাব্যবস্থা যখন করোনা মহামারির কবলে পড়ে খাবি খাচ্ছে, সেই সময়ে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ শুরু হলে তা হবে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। সুতরাং, সারা মহানগরের এডিস মশা ধ্বংস করতে হবে। মহানগরের বিভিন্ন স্থান জীবাণুমুক্ত করার পাশাপাশি মশকনিধনের কার্যক্রম আরও জোরদার করা হোক।