কুয়েটে চার শিক্ষার্থী বহিষ্কৃত

৪ জানুয়ারি মহাসমারোহে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৭৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্‌যাপিত হয়। কেন্দ্রীয় আয়োজন ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে; যেখানে সংগঠনের প্রচুরসংখ্যক নেতা-কর্মীর পাশাপাশি সংগঠনের সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের বেশ কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। সমাবেশে ছাত্রলীগের বর্তমান ও সাবেক নেতারা সংগঠনের কর্মীদের সুসংগঠিত ও আদর্শবান হওয়ার আহ্বান জানান। কিন্তু তাঁদের এ আহ্বান ছাত্রসংগঠনের কর্মীদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে পারেনি। সমাবেশস্থলে দাঁড়ানোকে কেন্দ্র করে প্রতিদ্বন্দ্বী নেতা-কর্মীদের মধ্যকার সংঘর্ষে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যসহ অনেকে আহত হন।

অতীতে এ দেশের স্বাধিকার ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে অন্যান্য ছাত্রসংগঠনের পাশাপাশি ছাত্রলীগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে ব্যতিক্রম বাদে ছাত্রলীগ সংবাদের শিরোনাম হওয়া মানে নেতিবাচক খবর, নেতা-কর্মীদের নানা অপকর্মের বয়ান। ছাত্রলীগের আগের কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে মেয়াদের আগেই বিদায় নিতে হয়েছে চাঁদাবাজির অপবাদ নিয়ে। যেদিন পত্রিকায় ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সমাবেশ ও শোভাযাত্রার খবর ও ছবি প্রকাশিত হয়, সেদিনই খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ছাত্রলীগের চারজন নেতা-কর্মীর চিরতরে বহিষ্কারাদেশের খবরও আসে।

ছাত্রলীগের কুয়েট শাখার সাধারণ সম্পাদক সাদমান নাহিয়ানসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী লালন শাহ হলের প্রাধ্যক্ষ ও ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের অধ্যাপক মো. সেলিম হোসেনকে চাপ দিয়ে আসছিলেন তাঁদের মনোনীত ব্যক্তিকে ডাইনিং ম্যানেজার করার জন্য। গত ৩০ নভেম্বর তঁারা সংঘবদ্ধ হয়ে অধ্যাপক সেলিম হোসেনকে বিভাগে তঁার কক্ষে নিয়ে গিয়ে তঁাদের দাবি মেনে নেওয়ার জন্য তঁার ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করেন। কয়েকজন তঁাকে গালাগালও করেন। অধ্যাপক সেলিম হোসেন সেখান থেকে বাসায় যাওয়ার কিছুক্ষণ পর মারা যান। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ও অধ্যাপক সেলিমের পরিবার এটিকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে অভিহিত করেছে।

যে চার শিক্ষার্থী কুয়েট থেকে চিরতরে বহিষ্কৃত হলেন, সে জন্য কাকে দায়ী করা যাবে? মা–বাবা এই মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছিলেন উচ্চশিক্ষা নেওয়ার জন্য। কিন্তু সেখানে গিয়ে তঁারা পড়াশোনার চেয়ে মাস্তানি-চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়লেন কার পৃষ্ঠপোষকতায়? অস্বীকার করার উপায় নেই যে ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মী হিসেবেই তঁারা ক্যাম্পাসে যা খুশি তাই করে বেড়িয়েছেন। তাঁরা যদি ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মী না হতেন, নেতৃত্বের আশ্রয়–প্রশ্রয় না পেতেন, তঁারা শিক্ষকের ওপর চাপ দেওয়া কিংবা তাঁর ওপর মানসিক পীড়ন চালানোর সাহস পেতেন না। হলের ডাইনিং কক্ষের যে ম্যানেজার হবেন, তা পুরোপুরি প্রশাসনিক বিষয়। এ ব্যাপারে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের নাক গলানোর কোনো সুযোগ নেই। তারপরও তাঁরা সেই গর্হিত কাজটি করেছেন এবং একজন শিক্ষককে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছেন। গত বছর বুয়েটে আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডে যঁারা দণ্ডিত হয়েছেন, তঁাদের সবাই ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী। যে সংগঠনের প্রভাব ও প্রতিপত্তির জোরে তঁারা এ অপকর্ম করেছেন, সেই সংগঠন কীভাবে এর দায় এড়াবে?

বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া যে ছাত্রলীগ অতীতে দেশের সব গণতান্ত্রিক ও স্বাধিকার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, সেই সংগঠনের নেতা-কর্মীদের এ পরিণতি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।