ক্রসফায়ার ও সাভারের সাংসদ

প্রথমে দেখা যাক তিনি মানবজমিনকে কী বলেছিলেন, ‘সাভারে অনেক ক্যাডার আর মাস্তান ছিল। এখন সব পানি হয়ে গেছে। কারও টুঁ–শব্দ করার সাহস নেই। ৫ জনকে ক্রসফায়ারে দিয়েছি, আরও ১৪ জনের লিস্ট করেছি। সব ঠান্ডা।’

তাঁর এই বক্তব্য প্রকাশিত হওয়ার পর প্রতিপক্ষ বিএনপি-যুবদলের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মনে যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে, তাতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। আতঙ্কগ্রস্ত ব্যক্তিদের একজন মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেছেন, তিনি আতঙ্কে গা ঢাকা দিয়ে আছেন। একজনের স্ত্রী প্রথম আলোর প্রতিবেদকের কাছে জানতে চেয়েছেন, সাংসদ এনামুর ক্রসফায়ারে দেওয়ার জন্য যেসব মানুষের তালিকা তৈরি করেছেন বলে বলেছেন, সেই তালিকায় তাঁর স্বামীর নাম আছে কি না। গত অক্টোবরে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত সাভার যুবদলের এক নেতার বড় ভাই প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘পত্রিকায় সাংসদের বক্তব্য দেখে মনে হলো যা মানুষ ধারণা করছিল, তা-ই ঠিক হইল। তাদের ক্ষমতা আছে, তারা ক্রসফায়ারে দিছে।’

সাংসদ এনামুরের বক্তব্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর দ্বারা বিচারবহির্ভূত হত্যা সম্পর্কে অনেকের মধ্যে প্রচলিত ধারণার প্রতিফলন রয়েছে, তা সে সত্য হোক বা না হোক। ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ, এনকাউন্টার ইত্যাদি নামে বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ অনেক পুরোনো। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর পক্ষ থেকে এ অভিযোগ যতই অস্বীকার করা হোক না কেন, মানুষ বিশ্বাস করে যে এই পদ্ধতিতে বিচারবহির্ভূত হত্যা ঘটে চলেছে। সাংসদ এনামুর এক দিন পর তাঁর বক্তব্যকে ‘অবিবেচনাসুলভ’ আখ্যায়িত করে তা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। কিন্তু এটা বলেননি যে তিনি যা বলেছেন, তা অসত্য। সুতরাং, প্রশ্ন হচ্ছে তাঁর এই অবিবেচনাসুলভ বক্তব্য থেকে কী একটি ভয়ংকর সত্য বেরিয়ে এসেছে যে সত্য গোপন রাখার ও অস্বীকারের চেষ্টা চলে আসছে? সাভারের মতো দেশের অন্য কোথাও কি একই ধরনের কোনো সত্য আমাদের অগোচরে রয়ে গেছে?

সাংসদ এনামুর বক্তব্য প্রত্যাহার করলেই তা ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হয় না। এ ব্যাপারে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া খুব জরুরি। শুধু সাভারে নয়, সারা দেশে সংঘটিত সব বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের ব্যাপারে নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো অংশের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের কোনো রাজনীতিকের এ ধরনের কোনো বেআইনি যোগসূত্র যে নেই, সেটা প্রমাণের জন্যই এ ধরনের তদন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে আমরা বলতে চাই যে ক্রসফায়ার আর চলতে দেওয়া উচিত নয়। র‍্যাব-পুলিশ তথা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে আইনবহির্ভূত সব পন্থা পরিত্যাগ করে যথাযথ আইনানুগ পন্থায় ফিরে আসতে হবে।