খুলনায় চিকিৎসক হত্যা

কোভিড–১৯ মহামারিতে দেশের চিকিৎসকেরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যখন একের পর এক মারা যাচ্ছেন, তেমন একটি সময়ে খুলনায় বেসরকারি ক্লিনিকের এক চিকিৎসককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এর চেয়ে ন্যক্কারজনক অপরাধ আর হতে পারে না। আমরা এ ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানাই। 

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, গত সোমবার খুলনা শহরে ‘রাইসা ক্লিনিক’ নামের এক বেসরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে অস্ত্রোপচারের সাহায্যে সন্তান প্রসব করানো এক নারীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে স্বজনেরা ক্লিনিকটির মালিক ডা. রকিব খানকে নির্মমভাবে প্রহার করেন এবং তার ফলে তিনি মারা যান। ডা. রকিব খান বাগেরহাট সরকারি মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলের অধ্যক্ষ। খুলনা শহরে তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে রাইসা ক্লিনিক স্থাপন করেন। করোনা মহামারির মধ্যে যখন অনেক বেসরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান চিকিৎসাসেবা স্থগিত রেখেছে, তখনো তিনি তাঁর ক্লিনিকটিতে সাধারণ রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা অব্যাহত রেখেছিলেন। এ অবস্থায় একজন রোগীর স্বজনদের হামলায় তাঁর খুন হওয়া শুধু তাঁর ও তাঁর পরিবারের জন্যই বিরাট এক ট্র্যাজেডি নয়, এ ঘটনা আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সেবা প্রদানকারী ও সেবাগ্রহীতাদের মধ্যকার সম্পর্কের অত্যন্ত নেতিবাচক একটি দিকও উঠে এসেছে। 

ভুল চিকিৎসা বা ডাক্তারের অবহেলার অভিযোগে হাসপাতাল-ক্লিনিকে হামলা ও ভাঙচুর চালানো, চিকিৎসকদের শারীরিকভাবে আঘাত করা ইত্যাদি ঘটনা মাঝেমধ্যেই ঘটে। সব ক্ষেত্রে রোগীদের আত্মীয়স্বজনের ক্ষোভের যুক্তিসংগত কারণও থাকে না। কিন্তু কারণ থাক বা না থাক, চিকিৎসক ও চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর কোনো কারণেই হামলা চালানোর অধিকার কারও নেই এবং কেউ তা করলে তা অবশ্যই দণ্ডযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ। 

খুলনার রাইসা ক্লিনিকে যে নারী মারা গেছেন, তাঁর স্বজনদের যদি মনে হয়ে থাকে যে চিকিৎসার ভুলেই তিনি মারা গেছেন, তাহলে তার প্রতিকারের জন্য তাঁরা আইনের আশ্রয় নিতে পারতেন; মামলা করাই ছিল একমাত্র আইনানুগ পন্থা। কিন্তু তাঁরা তা না করে ওই ক্লিনিকের মালিক ও চিকিৎসক রকিব খানের ওপর হামলা চালিয়েছেন এবং পরে হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু ঘটে। এ অপরাধের বিচার অবিলম্বে নিশ্চিত করতে হবে। নিহত চিকিৎসকের ভাই থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ একজনকে গ্রেপ্তার করেছে বলে জানিয়েছে। কিন্তু আমরা চাই অবিলম্বে সব আসামিকে গ্রেপ্তার করে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হোক এবং প্রত্যেকের আইনানুগ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। 

ডা. রকিব হত্যার প্রতিবাদে খুলনার চিকিৎসক সমাজ বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন। সেখানে বক্তারা যা বলেছেন, তা সরকার ও সমাজের মানুষের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তাঁরা বলেছেন, রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে অপ্রীতিকর ঘটনা বা চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর হামলা চালানো এ দেশে ‘একটা হুজুগে পরিণত হয়েছে। বিচারহীনতা ও প্রশাসনের উদাসীনতার কারণে রকিবের মতো গরিবের ডাক্তারকে আজ প্রাণ দিতে হয়েছে।’ সরকারি প্রশাসনের একান্ত দায়িত্ব এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া; কথিত ‘বিচারহীনতা’র অবসান ঘটানো। সেই সঙ্গে জনসাধারণের মধ্যেও এ বোধ জাগতে হবে যে কোনো অবস্থাতেই চিকিৎসক বা চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা চালানোর অধিকার কারও নেই। অভিযোগ থাকলে তার প্রতিকার পাওয়ার একমাত্র পথ আইনের শরণাপন্ন হওয়া। 

খুলনার চিকিৎসক সমাজ ডা. রকিব খানের হত্যার সঙ্গে জড়িত সব আসামিকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে। পুলিশের দায়িত্ব সব আসামিকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে সেখানকার চিকিৎসকদের অসন্তোষ দূর করা এবং স্বাভাবিক চিকিৎসা কার্যক্রম ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করা।