বলার অপেক্ষা রাখে না, লকডাউনের কারণে স্বল্প আয়ের মানুষগুলোই বেশি বিপদে পড়েছেন, যঁাদের বেশির ভাগই কাজ হারিয়েছেন। ছোটখাটো অনেক ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তা পথে বসেছেন। সরকারের কাছ থেকে এই অসহায় মানুষগুলোর যে সহায়তা পাওয়ার কথা, তার খুব সামান্যই পেয়েছেন। সরকার যে লক্ষাধিক কোটি টাকার প্রণোদনা দিয়েছে, তার সিংহভাগই পেয়েছেন বড় উদ্যোক্তারা। নিম্ন আয়ের মানুষের সহায়তায় প্রধানমন্ত্রী ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকার ৫টি নতুন প্রণোদনা প্যাকেজের ঘোষণা দিয়েছেন।
আমরা এই ঘোষণাকে স্বাগত জানাই। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক আগে থেকে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিল। দেরিতে হলেও আমরা প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণাকে স্বাগত জানাই। একই সঙ্গে ঘোষিত সহায়তা যাতে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ও হতদরিদ্র মানুষ পান, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সর্বোচ্চ সজাগ থাকার আহ্বান জানাই।
তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, হতদরিদ্র তো বটেই, নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষও কঠিন অবস্থার মধ্যে পড়েছেন। বিশেষ করে যাঁরা সহায়তার জন্য অন্যের কাছে হাত বাড়াতে পারেন না লোকলজ্জার ভয়ে। ফলে সরকারের দেওয়া ওএমএস বা খোলাবাজারে বিক্রির দোকান ও টিসিবির (ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ) ট্রাকের সামনে মানুষের সারি ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। টিসিবির পণ্য বিক্রয়ের সঙ্গে যুক্ত অনেকে বলেছেন, অতীতে তাঁরা এত দীর্ঘ লাইন কখনো দেখেননি। মঙ্গলবার প্রথম আলোয় সচিত্র যে খবর ছাপা হয়েছে, তাতে দেখা যায়, টিসিবির পণ্যের জন্য বিভিন্ন স্থানে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন। কোনো কোনো ট্রাকের সামনে ৬০ থেকে ৮০ জন মানুষ অপেক্ষমাণ ছিলেন। স্কুলপড়ুয়া শিশুসন্তানকে নিয়ে অনেক মা লাইনে দাঁড়িয়েছেন নিরুপায় হয়ে। এঁরা কেউ দারিদ্র্যসীমার নিচের মানুষ ছিলেন না।
টিসিবির অবস্থা হয়েছে ‘সাধ আছে, সাধ্য নেই’। যত মানুষ ট্রাক ও দোকানের সামনে ভিড় করছেন, তাঁদের সবাই পণ্য পাচ্ছেন না। প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, রাজধানীর ৬৭টি স্থানে সোমবার ট্রাকে করে ন্যায্যমূল্যে তেল, চিনি ও ডাল বিক্রি করেছে টিসিবি। খাদ্য অধিদপ্তর ১০টি ট্রাকে ওএমএসের মাধ্যমে রাজধানীতে চাল-আটা বিক্রি করছে। এর বাইরে পরিবেশকদের মাধ্যমে ৯৫টি দোকানেও ন্যায্যমূল্যে চাল-আটা বিক্রি করা হচ্ছে। বাজারদরের চেয়ে কম দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য তথা চাল, আটা, ভোজ্যতেল, ডাল ইত্যাদি পাওয়া যাচ্ছে বলে মানুষ সেখানে ভিড় জমাচ্ছেন। কোনো কোনো পণ্যের ক্ষেত্রে তা ২০ থেকে ৫০ শতাংশ কম।
এই অবস্থায় সরকারের উচিত টিসিবির মাধ্যমে পণ্য সরবরাহ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেওয়া। সে ক্ষেত্রে লকডাউনের কারণে যাঁরা কাজ ও জীবিকা হারিয়েছেন, প্রয়োজন ছিল তঁাদের কাছে বিনা মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য যতটা সম্ভব সরবরাহ করা। কিন্তু সরকার সেই কাজ করেনি। সে ক্ষেত্রে ওএমএসের পণ্যই তঁাদের একমাত্র ভরসা। এতে লকডাউনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলোর কষ্ট কিছুটা হলেও কমবে। একদিকে মানুষের আয় কমে গেছে, অন্যদিকে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছেই।
বিধিনিষেধ ১৫ জুলাই থেকে শিথিল করা হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে করোনা শিগগিরই চলে যাচ্ছে। এক সপ্তাহ বিধিনিষেধ শিথিল করলেই লকডাউনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সমস্যার সমাধান হয়ে যাচ্ছে না। তাই লকডাউনে ক্ষতিগ্রস্ত এই মানুষগুলোর প্রতি সরকারেরও দায়িত্ব আছে।