করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়াকে খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অশুভ ইঙ্গিত বলে মনে করছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সংক্রমণের সংখ্যা ছিল ৮ হাজার ৪০৭। সংক্রমণের হার ছিল ২৪ শতাংশের কাছাকাছি। দুই সপ্তাহ আগে এই হার ছিল ২ শতাংশ। সংক্রমণের নতুন ধরন অমিক্রনের সঙ্গে পুরোনো ধরন ডেলটার প্রকোপও আছে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি উদ্বেগজনকই বলতে হবে।
সংক্রমণ ঠেকাতে সম্প্রতি সরকার যে ১১ দফা নির্দেশনা জারি করেছিল, তা বাস্তবায়নের কোনো আলামত দেখা যাচ্ছে না। সরকারের নির্দেশনার মধ্যে আছে গণপরিবহন ও হোটেল-রেস্তোরাঁয় সেবাপ্রার্থীদের টিকা সনদ নিয়ে যেতে হবে। প্রথম আলোর খবর থেকে জানা যায়, গণপরিবহনের কত শতাংশ কর্মী টিকা নিয়েছেন, সেই পরিসংখ্যানই সংশ্লিষ্টদের কাছে নেই। এমনকি এই খাতের যাঁরা টিকা নেননি, তাঁদের অগ্রাধিকারের আওতায় আনার বিশেষ কোনো কর্মসূচিও নেই সরকারের কাছে। তৈরি পোশাক খাতের মালিকেরা সরকারের সঙ্গে দেনদরবার করে এই খাতের শ্রমিকদের টিকাদান নিশ্চিত করেছেন। গণপরিবহনের মালিকেরা সে রকম কোনো উদ্যোগই নেননি। তাঁরা অবশ্য বাস টার্মিনালগুলোকে টিকাকেন্দ্র খোলার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। যুক্তি ছিল, এই শ্রমিকেরা বেশির ভাগ সময় পরিবহনে অথবা টার্মিনালেই থাকেন। শ্রমিক সংগঠনগুলোর মতে, সড়ক পরিবহন খাতে শ্রমিক প্রায় ৫০ লাখ। এর সঙ্গে যানবাহন মেরামতসহ নানা কাজে যুক্ত শ্রমিক আছেন আরও প্রায় ২০ লাখ। সব মিলিয়ে বাস, ট্রাক, অটোরিকশা, নছিমন, করিমনের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ। এর মধ্যে শুধু যাত্রীবাহী বাসের শ্রমিকের সংখ্যা ১০ লাখের মতো। রেস্তোরাঁর কর্মী ও সেবাপ্রার্থীদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সেখানকার লাখ লাখ শ্রমিক টিকা কর্মসূচির বাইরে আছেন।
সরকারের দাবি, দেশে প্রচুর টিকা মজুত আছে। তাহলে দ্রুত অধিকসংখ্যক মানুষকে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে না কেন? বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকা নেওয়া ব্যক্তিদের চেয়ে টিকা না নেওয়া ব্যক্তিদের জন্য অমিক্রন কয়েক গুণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সোমবার সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ১ জানুয়ারি থেকে যাঁরা করোনায় মারা গেছেন, তাঁদের ৮০ শতাংশ টিকা নেননি।
তাঁরা কি ইচ্ছা করেই টিকা নেননি, না নেওয়ার সুযোগ পাননি? আমরা তো পরিসংখ্যানে দেখি, এখনো বিরাটসংখ্যক মানুষ টিকা কর্মসূচির বাইরে আছেন। বিশেষ করে গণপরিবহন, হোটেল-রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেশির ভাগই টিকা পাননি। এই প্রেক্ষাপটে সেবাপ্রার্থীদের টিকার সনদ চাওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
দ্বিতীয় সমস্যা হলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার সব ক্ষেত্রে উদাসীনতা। সরকারের নির্দেশনা ছিল মাস্ক না পরে ঘরের বাইরে গেলে জরিমানা দিতে হবে। অথচ হাটবাজার, মেলা, গণপরিবহন—সবখানেই ঢিলেঢালা ভাব। নির্দেশনা দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেও বাস্তবে কদাচিৎ ঘটছে। সরকারকে বুঝতে হবে যেখানে সংক্রমণ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, সেখানে ঢিলেঢালা পদক্ষেপ কোনো কাজে আসবে না। নাগরিকদেরও বুঝতে হবে, মাস্ক না পরে কিংবা স্বাস্থ্যবিধি না মেনে তাঁরা কেবল নিজেদেরই ক্ষতি করছেন না, ক্ষতি করছেন তাঁদের সংস্পর্শে আসা প্রতিটি মানুষের।
নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা ফিরে আসুক, সরকারেরও চৈতন্যোদয় হোক।