বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির নায়ক আবদুল হাই ওরফে বাচ্চুর বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ না নেওয়ার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। তবে এবারের প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। সাংসদ শেখ ফজলে নূর তাপস এই প্রথম নির্দিষ্টভাবে বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ নিতে বলেছেন। এমনকি দায়িত্ব পালন করতে না পারলে দুদক চেয়ারম্যানকে পদত্যাগ করতে বলেছেন। সরকারের সাম্প্রতিক ক্যাসিনো ও দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে সাংসদ তাপসের এ আহ্বান কোনো সুফল বয়ে আনবে কি না, সেটাই প্রশ্ন।
তবে সার্বিক বিচারে আবদুল হাইয়ের অবস্থানটি ঘোরতরভাবে অনৈতিক এবং সমতার নীতির পরিপন্থী। এই একটি উদাহরণ অব্যাহতভাবে গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থার দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রতিষ্ঠান হিসেবে কোনোভাবেই এর দায় এড়াতে পারে না। উদ্বেগের বিষয় হলো বেসিক ব্যাংক উপাখ্যান দুদককে ‘পিক অ্যান্ড চুজ’ নীতির ধারক–বাহকের ভাবমূর্তি দিয়েছে। সাংসদ তাপস যথার্থই মন্তব্য করেছেন যে বেসিক ব্যাংকের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে যে দুর্নীতি হয়েছে, তার মূল ব্যক্তি আবদুল হাই। দুদক এ পর্যন্ত বেসিক ব্যাংকের ঘটনায় ৬১টি মামলা করেছে। সংশ্লিষ্ট অনেক ব্যবসায়ী ও ব্যাংকার গ্রেপ্তার হয়েছেন। অনেকে কারাগারেও আছেন। কিন্তু ব্যতিক্রম হলেন সাবেক চেয়ারম্যান। তঁাকে আইনের আওতায় আনা বলতে এ পর্যন্ত শুধু জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
দুদক চেয়ারম্যানের দায় কোথায়, সেটা বুঝতে পারছে না দুদক। একজন মুখপাত্র সাংবাদিকদের কাছে গতকাল যা বলেছেন, সেটা ধরেই নিতে হবে দুদক চেয়ারম্যানের বক্তব্য। দুদক সচিব বুঝতেই পারছেন না দুদক চেয়ারম্যানের পদত্যাগের যৌক্তিকতা কী। তিনি অভিনব তত্ত্ব হাজির করেছেন যে, ‘সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা কোথায় ব্যবহার হয়েছে কিংবা জমা হয়েছে, নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না।’ এই যুক্তি হাস্যকর। তাহলে বেসিকের মামলায় অন্য যাঁরা গ্রেপ্তার হয়েছেন তাঁরা বলবেন, ‘আমরা তাহলে কী করে “দোষী সাব্যস্ত” হলাম?’ প্রকৃতপক্ষে দোষী সাব্যস্ত করার দায়িত্ব দুদকের নয়, আদালতের। দুদকের কাজ অভিযোগপত্রটি আদালতে পেশ করার। আবদুল হাইয়ের বিরুদ্ধে যেসব প্রমাণ ইতিমধ্যে পাওয়া গেছে, তাতে তঁাকে অভিযোগপত্রভুক্ত করার জন্য যথেষ্ট বলে ধারণা করি।
বাংলাদেশ ব্যাংক, সংসদীয় স্থায়ী কমিটি ও নিরীক্ষা—প্রতিটি পর্যায়ে আবদুল হাইয়ের নাম এসেছে। প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে, তিনিই নাটের গুরু। অথচ দুদক সচিব দাবি করছেন যে অধিকাংশ নগদে উত্তোলন হওয়া টাকাগুলো ‘কোথায় ব্যবহার বা জমা’ হয়েছে, তা দুদকের তদন্ত কর্মকর্তারা এখনো বের করতে পারেননি। এই সাফাই বক্তব্য দুর্ভাগ্যজনক ও অগ্রহণযোগ্য। বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদনগুলোর প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর শামিল। দুদক মুখপাত্র যে ঢিলেঢালা দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নামকাওয়াস্তে একটি সংবাদ সম্মেলন করেছেন, তা অত্যন্ত দুঃখজনক। এমনকি তারা বেসিক ব্যাংক দুর্নীতি মামলার অভিযোগপত্র কবে জমা দেওয়া হবে, সেটি জানাতে বা মামলাটির অগ্রগতি সম্পর্কে আশ্বস্ত হওয়ার মতো কোনো কিছু হাজির করতে তারা ব্যর্থ হয়েছে।
দুদক সচিব বেসিক ব্যাংকের তদন্তপ্রক্রিয়া ও জবাবদিহি প্রশ্নে যে কথিত মতে ‘দোষী সাব্যস্ত’ হওয়ার মানদণ্ড স্থির করেছেন, সেটা দুদকের অন্যান্য দুর্নীতির মামলায়ও অনুসরণের দাবি রাখে। দুদকের একজন আইনজীবী দাবি করেছেন যে বেসিকের দুই হাজার কোটি টাকা উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তখন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে টাকা উদ্ধারের দায়িত্ব দুদককে কে দিয়েছে। এটা দেখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের অন্য অনেক সংস্থার আছে। টাকা তোলার গল্প শোনানো প্রকারান্তরে লুটেরার পক্ষে সাফাই গাওয়া।
দুদকের স্ববিরোধী ও বৈষম্যমূলক নীতির অবসান হোক।