সব সরকারি চাকরিপ্রত্যাশী ও গাড়িচালকদের জন্য ডোপ টেস্ট বা মাদক পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার পর হযবরল অবস্থা তৈরি হয়েছে। নির্ধারিত হাসপাতালগুলোতে সেবাপ্রার্থীরা ভিড় জমালেও সময়মতো পরীক্ষা করাতে পারছেন না। ফলে তাঁরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। গত শনিবার প্রথম আলোর খবরের শিরোনাম ছিল, মাদক পরীক্ষা কম, ভোগান্তি বেশি। বিশেষ করে পরীক্ষার জন্য বাইরে থেকে ঢাকায় এসে দিনের পর দিন অনেককে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত ফির চেয়ে অনেক বেশি খরচ হচ্ছে।
২০১৮ সালে সরকারের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল: ব্যাংক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিসিএস ক্যাডার, নন ক্যাডার, সরকারি যেকোনো চাকরিতে যোগদানের আগে ডোপ টেস্ট করতে হবে। ২০১৯ সালে পাঁচ ধরনের মাদকদ্রব্য পরীক্ষার জন্য পরিপত্র জারি করা হয়; যার মধ্যে আছে বেনজোডায়াজেপিন (ঘুমের ওষুধ), অ্যামফেটামিন (ইয়াবা), অপয়েটস (হেরোইন, মরফিন, কোকেন), ক্যানাবাইনয়েডস (গাঁজা) ও অ্যালকোহল (মদ)। প্রস্রাবের নমুনা পরীক্ষা করে দু-তিন ঘণ্টার মধ্যে ফলাফল জানিয়ে দেওয়া সম্ভব।
২০২০ সালে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গাড়িচালকদের জন্য মাদক পরীক্ষা করার কথা বলেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর এ ঘোষণার প্রায় দেড় বছর পর চলতি বছরের শুরুতে বিআরটিএ জানিয়ে দেয়, ৩০ জানুয়ারি থেকে পেশাদার মোটরযান চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া ও লাইসেন্স নবায়নের আবেদনের সঙ্গে মাদক পরীক্ষার সনদ জমা দিতে হবে।
এরপর থেকেই হাসপাতালগুলোতে মাদক পরীক্ষার জন্য মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। বাংলাদেশে ২০ লাখ পেশাদার গাড়িচালক আছেন; যঁাদের সবাইকে নতুন লাইসেন্স নিতে হয় কিংবা পুরোনো লাইসেন্স নবায়ন করতে হয়। ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, সরকারি হাসপাতালে মাদক পরীক্ষা করার কথা বলা হলেও ঢাকার বাইরের অনেক হাসপাতালেই এই সুযোগ নেই। যেসব হাসপাতালে সুবিধা আছে, সেখানেও লোকবলের স্বল্পতা আছে। মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের হিসাব অনুযায়ী, বিআরটিএ ৩০ জানুয়ারি থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৮ হাজার ৭৮২টি ডোপ টেস্টের আবেদন বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠিয়েছিল। এর মধ্যে ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ডোপ টেস্টের সনদ জমা হয়েছিল মাত্র ১ হাজার ৮৯৯টি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালক (চিকিৎসা ও পুনর্বাসন) জানিয়েছেন, ডোপ টেস্টের বিষয়ে একটি বিধিমালা চূড়ান্ত করা হচ্ছে। ডোপ টেস্ট বিষয়ে একটি প্রকল্প প্রণয়নের কাজও প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। এ প্রকল্পের আওতায় দেশের ২২টি জেলায় ডোপ টেস্টের ব্যবস্থা করা হবে। বিষয়টি ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়ার মতো। মাদক পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার পর এখন তাঁরা বিধিমালা চূড়ান্ত করছেন, ২২ জেলায় পরীক্ষার ব্যবস্থা করার কথা বলছেন।
এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, পেশাদার গাড়িচালকদের মধ্যে ৬০ শতাংশই মাদকসেবী। পুলিশ বিভাগের অনেক সদস্যের বিরুদ্ধে মাদক সেবনের অভিযোগ আছে। এ অবস্থায় ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত খুবই সময়োচিত পদক্ষেপ বলে মনে করি। কিন্তু এ রকম একটি ভালো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সদিচ্ছা ও সক্ষমতা থাকতে হবে। যেসব সরকারি হাসপাতালে এখনো মাদক পরীক্ষার সুবিধা নেই, সেসব হাসপাতালে অবিলম্বে তার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও এ পরীক্ষার অনুমতি দেওয়া যেতে পরে। তবে সে ক্ষেত্রে সরকারকে সজাগ থাকতে হবে মাদক পরীক্ষার নামে যেন কেউ ভুয়া সনদ দিতে বা নিতে না পারে।