default-image
স্থপতি ও নগর-পরিকল্পনাবিদ জেরিনা হোসেন সিলেট লিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস বাংলাদেশ (আইএবি) সিলেট শাখার সভাপতি এবং ফোরাম ফর প্ল্যানড চিটাগংয়ের সাধারণ সম্পাদক। কমলাপুর স্টেশন, টিএসসিসহ দেশের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশ্বজিৎ চৌধুরী

প্রথম আলো: কমলাপুর রেলস্টেশন ও এর আশপাশের রেলের জায়গা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে বরাদ্দ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভাঙতে হবে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটি। এই ব্যাপারটাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

জেরিনা হোসেন: দেখুন, কমলাপুর রেলস্টেশনকে আমাদের দেশের আধুনিক স্থাপত্যের প্রতীক বলা যেতে পারে। একটি আর্দ্র গ্রীষ্মপ্রধান দেশে বিপুলসংখ্যক মানুষের ব্যবহারের উপযোগী এ রকম নকশা ও নির্মাণশৈলী সত্যিই উঁচু মানের স্থাপত্যশিল্পের নিদর্শন। এটা নিছক বাণিজ্যিক কারণে এ রকম একটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ভেঙে ফেলা, যার এখনো ব্যবহারিক আয়ুষ্কাল ফুরিয়ে যায়নি, একেবারেই অনুচিত বলে আমি মনে করি।

বিজ্ঞাপন

রেলের আয় বাড়ানো বা অবকাঠামোগত উন্নয়ন—কোনোটির প্রয়োজনই তো অস্বীকার করা যায় না...

জেরিনা হোসেন: আমাদের দেশের মানুষ নিরাপদ ও সাশ্রয়ী যোগাযোগ ও যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে রেলওয়েকে অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছে, এখনো দেয়। এই চাহিদাকে মাথায় রেখে সৃষ্টিশীল পরিকল্পনা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রেলওয়ে তার আয় বাড়াতে পারে। উন্নয়নের নামে ঐতিহ্য ধ্বংস করার প্রয়োজন হবে না। তা ছাড়া দেশব্যাপী রেলওয়ের বহু জমি বেদখল হয়েছে, অবহেলায় পড়ে আছে, সেখানেই তো সরকারি-বেসরকারি যৌথ অংশীদারত্বে আয়বর্ধক প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) ভেঙে ফেলে সেখানেও নতুন করে স্থাপনা গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা শোনা গিয়েছিল। স্থপতি ও নগর-পরিকল্পনাবিদেরা এর বিরোধিতা করছেন...

জেরিনা হোসেন: টিএসসি তো একটি স্থাপনা নয় শুধু, এর সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের, মানে আমাদের দেশের সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক বহু স্মৃতি ও ইতিহাস জড়িয়ে আছে। ভবনটির নির্মাণ-পরিকল্পনার মধ্যে এর ব্যবহারোপযোগিতা ও নান্দনিকতার যে প্রকাশ, তা আমাদের স্থাপত্যশিল্পের আধুনিক যুগে প্রবেশের একটি উদাহরণ। স্বাভাবিকভাবেই স্থপতিরা এই ভবন ভাঙার উদ্যোগ মেনে নিতে পারছেন না, এটি সংরক্ষণের দাবি তুলেছেন।

কিন্তু এ বিষয়ে আপনাদের বিকল্প কোনো প্রস্তাব কি আছে?

জেরিনা হোসেন: ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস বাংলাদেশ (আইএবি) দেশের সেরা স্থপতিদের নিয়ে একটি বিশেষ দল গঠন করেছে। তাঁরা ইতিমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারপ্ল্যান সংগ্রহ করে এর বিভিন্ন ভবন, জমি ও তার ব্যবহার চিহ্নিত করেছেন। আইএবির একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করে তাদের মতামত জানিয়েছে। অন্যদিকে, টিএসসিকে অক্ষত রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্ধিত চাহিদা যাতে মেটানো যায়, সে রকম একটি স্থাপত্য-নকশা তৈরির প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হচ্ছে।

কয়েক দিন আগে চট্টগ্রামে দেশপ্রিয় যতীন্দ্র মোহন সেনের ভিটেবাড়ি দখল ও পুরোনো অবকাঠামো ভেঙে ফেলার চেষ্টা সচেতন নাগরিক সমাজ রুখে দিয়েছে। এটা আপাতত রক্ষা পেয়েছে, কিন্তু ভূমিদস্যুরা তো দীর্ঘদিন হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না...

জেরিনা হোসেন: ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে অবজ্ঞা করলে একটা নগরের বাসযোগ্যতা তলানিতে পৌঁছায়। ভূমিদস্যুরা সুযোগ খোঁজে। আঘাত হানে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে দুর্বল শ্রেণির ওপর। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে তারা চট্টগ্রামে দেশপ্রিয় যতীন্দ্র মোহন সেনের ভিটেমাটিতে হাত দেওয়ার স্পর্ধা দেখিয়েছে। তবে এটা উৎসাহব্যঞ্জক যে সচেতন নাগরিক সমাজ তা প্রতিহত করতে পেরেছে। প্রশাসনের উচিত এসব ঐতিহ্যকে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া, ভবিষ্যতে যাতে ভূমিদস্যুদের কুদৃষ্টি এদিকে না পড়ে।

বিজ্ঞাপন

সিলেটের আবু সিনহা ছাত্রাবাস, ঢাকায় ফার্মগেটের খামারবাড়ি, পুরান ঢাকায় নানা স্থাপনাসহ অসংখ্য ভবন ভেঙে ফেলা হয়েছে বা অবহেলিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এগুলো সংরক্ষণের উপায় কী?

জেরিনা হোসেন: আপনি বিশেষভাবে যে দুটি স্থাপনার কথা উল্লেখ করলেন, সেগুলো বিশেষ একটি সময় ও বিশেষ স্থাপত্যশৈলীর স্মারক। সিলেটের আবু সিনহা ছাত্রাবাস ১৮৭০ সালে আসামের স্থাপত্য ও নির্মাণনীতির এক অনন্য উদাহরণ। এটি ছিল সিলেটের প্রাচীনতম ভবন ও সিলেটের প্রথম হাসপাতাল, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েও ব্যবহার করা হয়েছে। নাগরিকদের প্রতিবাদ, এমনকি সিলেটের শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতার আশ্বাসের পরও ভবনটি রক্ষা করা যায়নি।

ঢাকার ফার্মগেটের খামারবাড়ি ও সিলেটের আবু সিনহা ছাত্রাবাস যে প্রক্রিয়ায় ভেঙে ফেলা হয়েছে, তা একটি গণতান্ত্রিক দেশের নগর উন্নয়নের উদাহরণ হতে পারে না। আমাদের দেশে নগরচিন্তা, পরিকল্পনা ও পরিচালনের প্রক্রিয়া প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সীমিত ও আইনগতভাবে দুর্বল। এ দুর্বল অবস্থানের কারণে আমরা প্রতিবাদ করেও ঐতিহ্য রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছি।

নাগরিকদের আন্দোলনের মুখে ব্রিটিশ আমলে নির্মিত চট্টগ্রামের আদালত ভবন ভেঙে ফেলার পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছিল সরকার। কিন্তু সেখানকার বিস্তৃত বাগান ও মুক্তাঙ্গন রক্ষা করা যায়নি। জনসংখ্যার চাপ আর স্থান সংকুলানের অভাব—এ দুটো সমস্যাকে সামলানোর উপায় কী?

জেরিনা হোসেন: একটি নগরে জনসংখ্যা স্বাভাবিক নিয়মেই বাড়বে। তার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে জীবিকার তাগিদে গ্রামাঞ্চল থেকে আসা মানুষ। নগরের মাস্টারপ্ল্যানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সম্ভাবনার কথা উল্লেখ থাকে। তার বিস্তার কোথায়, কীভাবে হবে, তার সুপারিশও থাকে। ১৯৬১ সালে প্রণীত চট্টগ্রামের মাস্টারপ্ল্যানে এসব উল্লেখ ছিল। কিন্তু ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এ বিষয়ের প্রতি কোনো গুরুত্বই দেওয়া হয়নি। তাই আদালত ভবনের অপূর্ব স্থাপত্যশৈলীর চারপাশে বাগান ও মুক্তাঙ্গনের পরিবর্তে গড়ে উঠেছে বস্তি।

দিনাজপুরে কান্তজির মন্দির এখনো পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র। কিন্তু সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে এর দেয়ালে খোদাই করা অসাধারণ টেরাকোটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এসব ব্যাপারে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত?

জেরিনা হোসেন: দিনাজপুরের কান্তজির মন্দিরের টেরাকোটা এ উপমহাদেশের এক বিরল শিল্পনিদর্শন। কিন্তু এর রক্ষণাবেক্ষণের কোনো ভালো উদ্যোগ নেই। মনোরম গ্রামীণ পরিবেশে অবস্থিত এ মন্দিরে যাওয়ার ব্যবস্থা যেমন সন্তোষজনক নয়, তেমনি মন্দির চত্বরসহ সর্বত্র অব্যবস্থাপনার ছাপ। মূল ভবন ও এর অঙ্গন দেখভাল করার জন্য দক্ষ কেউ আছে বলে মনে হয় না। মন্দিরের পশ্চিম প্রান্তে এক সারি টিনের ঘরসমেত আনসার ক্যাম্প, প্রবেশপথে ভ্যানগাড়িতে পসরা সাজিয়ে হকারদের ভিড়, পরিচ্ছন্ন শৌচাগারের অভাব—এসব সমস্যা দূর করতে পারলে এখানে পর্যটকদের ভিড় বাড়বে। তখন এমনকি প্রবেশমূল্যও নির্ধারণ করা যেতে পারে। সারা বিশ্বেই তো পর্যটন এখন সরকারি-বেসরকারি বড় আয়ের উৎস হিসেবে বিবেচিত।

আমাদের একটি প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ আছে। কিন্তু স্থাপত্য ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে তারা?

জেরিনা হোসেন: আমাদের আসলে দরকার জাতীয় পর্যায়ে স্থপতি, পরিকল্পনাবিদ, ইতিহাসবিদ ও সংস্কৃতিমনস্ক মানুষের সমন্বয়ে একটি হেরিটেজ কাউন্সিল বা কমিশন প্রতিষ্ঠা করা, যার অধীনে দেশের ঐতিহ্য, পুরাকীর্তি ও ঐতিহাসিক স্থাপনার শ্রেণিবিন্যাস করে তা সংরক্ষণের পরিকল্পনা করা যায়। একটি নীতি বা গাইডলাইন তৈরি করতে হবে, যার মাধ্যমে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন বা স্থানীয় সরকার ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ নেবে। সচেতন নাগরিক, বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আগে বুঝতে হবে অতীত মানে তো ধ্বংসস্তূপ নয়। আমাদের গর্ব করার মতো অনেক কিছুই সেই অতীতের গর্ভেই আছে। এগুলো আমাদের পূর্বসূরিদের সক্ষমতার প্রতীক, আমাদের ইতিহাসের অধ্যায়। এর উত্তরাধিকার থেকে পরবর্তী প্রজন্মকে বঞ্চিত করা উচিত হবে না।

প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।

জেরিনা হোসেন: ধন্যবাদ।

সাক্ষাৎকার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন