বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো: করোনাকালে তো দেশে বন্য প্রাণী হত্যা বেড়েছে। গত এক বছরে ৩৩টি হাতি মারা গেল।

রেজা খান: হাতিগুলো মারা যাচ্ছে মূলত শেরপুর, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামে। তাদের বিদ্যুতায়িত করে মেরে ফেলা হচ্ছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত হাতি হত্যার সঙ্গে যুক্ত কতজনকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে? দেশে হাতি আছে সর্বসাকল্যে দুই-আড়াই শ। এই সামান্য কয়েকটি প্রাণীকে আমরা রক্ষা করতে পারছি না! অবশিষ্ট যে কটি আছে, তাকে এভাবে মেরে ফেলা সম্ভব হচ্ছে; কারণ, এসব হত্যাকাণ্ডে কোনো বিচার হচ্ছে না। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্য প্রাণী হত্যা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এভাবে হাতি হত্যা একটি ফৌজদারি অপরাধ। মানুষ হত্যার জন্য যেভাবে বিচার হয়, হাতি ও বাঘ হত্যায় সেভাবে বিচার হতে হবে। এ ব্যাপারে আমাদের বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইন আছে। কিন্তু তার কোনো বাস্তবায়ন দেখছি না। হত্যাকারীরা নিশ্চিত হয়ে গেছে তাদের বিচার হবে না।

default-image

প্রথম আলো: হাতি তো মূলত ফসল পাকার মৌসুমে গ্রামে ঢুকে পড়ে। ধানসহ অন্যান্য ফসল খায়। যে কারণে গ্রামবাসী ফসলের জমির চারদিকে বিদ্যুতের তার দিয়ে ঘিরে রাখে। তাতে বিদ্যুৎ স্পৃষ্ট হয়ে হাতি মারা যাচ্ছে। এর সমাধান কী?

রেজা খান: হ্যাঁ, সাধারণ গ্রামবাসীর প্রধান ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা অবশ্যই তাদের জন্য বড় সমস্যা। তবে এই সমস্যা দূর করার দায়িত্ব সরকারের। হাতির কারণে কোনো এলাকার ফসল নষ্ট হলে সরকার তার ক্ষতিপূরণ দিতে পারে। হাতি গ্রামে ঢুকে পড়লে মানুষ তাদের যেভাবে তাড়া করে, তাতে এই প্রাণী আরও ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। এতে তারা মানুষের বাড়িঘর নষ্ট করে। এসব সম্পদের ক্ষতিপূরণও দেওয়া উচিত। এই ক্ষতিপূরণের হিসাব বন বিভাগের পক্ষ থেকে করলে হবে না। একটি নিরপেক্ষ দল দিয়ে তা তদন্ত করাতে হবে। সেখানে বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ এবং আর্থসামাজিক বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের রাখতে হবে। সেটা বন বিভাগের নেতৃত্বে হতে পারে। কারণ, বন বিভাগ এককভাবে ওই কমিটি করলে তারা ক্ষতিপূরণের হিসাব কম বা বেশি করতে পারে।

প্রথম আলো: হাতি হত্যা বন্ধে আর কোনো উপায় আছে?

রেজা খান: বাংলাদেশের হাতিগুলো কিছু নির্দিষ্ট পথ দিয়ে চলাচল করে। ওই পথে হাতির জন্য প্রয়োজনীয় ফসল ও ফল হয় এমন গাছ রোপণ করা যেতে পারে। তাহলে তারা খাদ্যের জন্য বসতি এলাকার কৃষিজমিতে যাবে না। বাঁশের যেসব প্রজাতি হাতির পছন্দ, তা রোপণ করা যেতে পারে।

default-image

প্রথম আলো: বাংলাদেশের মতো অর্থনৈতিক ক্ষমতার দেশ ভারত, শ্রীলঙ্কা ও নেপাল কীভাবে হাতি রক্ষায় সফল হয়েছে?

রেজা খান: বিশেষ করে ভারত হাতি রক্ষায় প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করছে। সেখানে হাতিসহ বন্য প্রাণী রক্ষায় নিবেদিতপ্রাণ কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা বন্য প্রাণী রক্ষাকে চাকরি হিসেবে মনে করে না, দায়িত্ব মনে করে। আমাদের এখানে বন্য প্রাণী রক্ষার দায়িত্বে যেসব কর্মকর্তা রয়েছেন, তাঁদের অনেকে মনে করেন, এটা সকাল নয়টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত চাকরি করার মতো ব্যাপার। এ ধরনের মনোভাব দিয়ে হাতি কেন, কোনো বন্য প্রাণী রক্ষা করা যাবে না।

প্রথম আলো: বন বিভাগের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চল নামে আলাদা একটি ইউনিট আছে। বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট আছে।

রেজা খান: বন বিভাগের মধ্যে থাকা এসব ইউনিট দিয়ে কাজ হবে না। এ জন্য আলাদা স্বতন্ত্র বিভাগ লাগবে। কারণ, দেশে কোথাও বন্য প্রাণী মারা গেলে, যাঁরা মেরেছেন তাঁদের শাস্তির বিধান আছে। কিন্তু কাদের দায়িত্বে অবহেলায় এই হত্যা হলো, আমরা কাদের দায়ী করব, সেটা কোথাও বলা নেই। বন বিভাগের এখন যে বন্য প্রাণীবিষয়ক ইউনিট আছে, তাদের এ ব্যাপারে বললে তারা বলে আমাদের লোকবল নেই। অফিস বন্ধ তো, তাদের কাজও বন্ধ। টহল দেওয়ার জন্য গাড়ি নেই, স্পিডবোট ও ট্রলারের জন্য তেল নেই। এমন অনেক রকমের কথা আপনারা শুনবেন। তাই বন্য প্রাণী রক্ষায় দেশে সুনির্দিষ্টভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত একটি সংস্থা গঠন করতে হবে। তাদের যথেষ্ট দক্ষ লোকবল ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং তহবিল দিতে হবে। আবার দায়িত্ব অবহেলার কারণে কোনো বন্য প্রাণী মারা গেলে তার জন্য জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকতে হবে। দায়িত্বে অবহেলায় শাস্তি এবং ভালো কাজে পুরস্কার দিতে হবে।

প্রথম আলো: দেশে প্রচুর বন্য প্রাণী সাফারি পার্ক হচ্ছে। এগুলো বন্য প্রাণী রক্ষায় কতটা কার্যকর।

রেজা খান: এ ধরনের সাফারি পার্ক হচ্ছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। অবকাঠামো নির্মাণ করলে এটাকে উন্নয়ন হিসেবে দেখানো যায়। অনেক রাজনীতিবিদ মানুষকে যেভাবে বোঝাতে পারেন, আমরা তা পারি না। বলা হয় আমরা এসব প্রাণী বাঁচানোর কথা বলি, কারণ এটা আমাদের পেশা।

default-image

প্রথম আলো: বাংলাদেশ থেকে বন্য প্রাণী পাচার হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে তা উঠে আসছে।

রেজা খান: বাংলাদেশ থেকে বাঘের চামড়াসহ বেশ কিছু বন্য প্রাণী পাচার হয়। তবে বন্য প্রাণী পাচারের পথ হিসেবে বাংলাদেশ বেশি ব্যবহৃত হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বিমানযোগে বাংলাদেশে বন্য প্রাণী আসে। এগুলো আটকানোর মতো ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশে নেই। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের অনেক কর্মকর্তা কোন প্রাণী আমদানি অবৈধ আর কোনটা বৈধ, তা জানেন না। ফলে এখান দিয়ে বন্য প্রাণী এনে অন্য দেশে পাচার করা সহজ। মূলত ভারতের বিভিন্ন চিড়িয়াখানায় অনেক বন্য প্রাণী বাংলাদেশের মাধ্যমে পাচার হয়। আবার ভারত থেকে অনেক বন্য প্রাণী বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে, অন্য দেশে যায়। এটা খুবই মারাত্মক; কারণ, এর মানে হচ্ছে বন্য প্রাণীকেন্দ্রিক অপরাধী চক্র বাংলাদেশে সক্রিয় আছে।

মাঝখানে আমরা দেখেছি, বিরল প্রজাতির সিংহ, পাখি ও প্রাণী বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় আটক হয়েছে। এ ছাড়া থাইল্যান্ড, চীনসহ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে এখান থেকে প্রচুর পরিমাণ কচ্ছপ পাচার হয়। বৈশ্বিক নানা প্রতিবেদনে এসব বন্য প্রাণী হত্যাকারী ও চোরাচালানকারী চক্রকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই চক্রের অনেক গ্রেপ্তার হয়েছে। কিন্তু বেশির ভাগই প্রমাণের অভাবে ছাড়া পেয়ে যায়। ফলে আমাদের বন্য প্রাণী চোরাচালানকারী চক্রের ঠিকমতো বিচার না হলে তাদের এসব কার্যক্রম বন্ধ হবে না।

প্রথম আলো: দেশে তো অনেক বড় বড় অবকাঠামো হচ্ছে। যার অনেকগুলো বনের জমিতে হচ্ছে। রেললাইন, সড়ক ও বড় অবকাঠামোর অনেকগুলো বনের মধ্যে হচ্ছে।

রেজা খান: আমাদের মতো এত ছোট আয়তনের এবং বিশাল জনসংখ্যার দেশে উন্নয়নের জন্য অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। কিন্তু বিশ্বের
বেশির ভাগ দেশে বনের ভেতরে বড় অবকাঠামো নির্মাণ নিরুৎসাহিত করা হয়। কারণ, জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বনভূমি ধ্বংস না করার অঙ্গীকারে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করেছে। ফলে দেশের আইন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার দুই দিক থেকে বাংলাদেশের উচিত হবে না বনের এক ইঞ্চি জমিও অন্য কোনো কাজে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া। বাংলাদেশের উচিত ধ্বংস হওয়া বনে পুনরায় যাতে বনভূমি সৃষ্টি করা যায়, সে জন্য চেষ্টা করা। উপকূলীয় এলাকাগুলোতে বনায়ন করা। যাতে সেখানে বন্য প্রাণীরা বসবাসের সুযোগ পায়। উন্নয়ন বলতে শুধু অবকাঠামো নির্মাণকে বুঝলে হবে না। বনভূমি রক্ষা করা এবং বন্য প্রাণীদের বসবাসের ভালো পরিবেশ নিশ্চিত করাটাও আমাদের জন্য উন্নয়ন। এটা মনে রেখে সরকারকে এগোতে হবে।

প্রথম আলো: দেশের বিদ্যমান বন্য প্রাণীর আবাস ও বনভূমিগুলো কীভাবে রক্ষা করা যেতে পারে?

রেজা খান: দেশের অনেক বনভূমির ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে বসতি তৈরি হয়েছে। অনেক সংরক্ষিত বন শুধু কাগজ–কলমে আছে। কিন্তু সেখানে স্থানীয় সরকার থেকে ইউনিয়ন ঘোষণা করা হয়েছে। মাতামুহুরী থেকে শুরু করে কাসালং বনভূমিতে গিয়ে আমি দেখেছি, চারপাশে কিছু গাছ আছে, যা দেখে বনভূমি মনে হয়। কিন্তু ভেতরে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে কোনো বন ও বন্য প্রাণী নেই। সব গাছ কেটে সেখানে কৃষিজমি ও নানা অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। বন বিভাগ থাকতে তা কীভাবে হলো। তারা এসব অবৈধ দখলদারদের কেন উচ্ছেদ করছে না। তবে বন বিভাগের একার পক্ষে অনেক প্রভাবশালী বনখেকোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না। সরকারের অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে হবে।

প্রথম আলো: আমাদের এখানে তাহলে বন্য প্রাণীর ভবিষ্যৎ কী?

রেজা খান: দেশে যেভাবে বন্য প্রাণী হত্যা হচ্ছে, তাতে আগামী ১০০ বছর পর দেশের এক নম্বর বন্য প্রাণী হবে টিকটিকি। তারপর তেলাপোকা, ইঁদুর ও মশা। চামচিকাও থাকবে কি না, সন্দেহ আছে। কারণ, মানুষ পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতার নামে সব বন্য প্রাণীর আশ্রয় নষ্ট করে ফেলবে। কারণ, এখানে গাছ থাকলে তাকে বন বলা হচ্ছে। কিন্তু বনভূমি নামে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা বৃক্ষ, লতাগুল্ম ও বন্য প্রাণী মিলে হয় বনভূমি। সেগুলো রক্ষা করতে না পারলে এই দেশে আর বন্য প্রাণী থাকবে না।

সাক্ষাৎকার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন