বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মতিউর রহমান: ছাত্রীদের সঙ্গে আপনাদের যোগাযোগ হচ্ছিল কীভাবে?

কামাল আহমেদ: ছাত্রীদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগটা হচ্ছিল ফোনে। হোয়াটসঅ্যাপেই বেশির ভাগ সময় যোগাযোগ হচ্ছিল। প্রতিটি বাসের নেতা যে ছাত্রী ছিল, আমি তার সঙ্গে যোগাযোগ করছিলাম। তারাই কথা বলছিল অন্যান্য ছাত্রীর সঙ্গে।

default-image

মতিউর রহমান: আপনি বলতে চাইছেন, কাবুলে আপনাদের কোনো লোক ছিল না?

কামাল আহমেদ: না। আমরা যারা চট্টগ্রামে আছি, আমাদের যোগাযোগ ছিল মূলত ওই নেতাদের সঙ্গে। ছাত্রীরাই কাজ করছিল। হোয়াটসঅ্যাপ ছাড়া আর কোনো যোগাযোগের মাধ্যমও ছিল না।

মতিউর রহমান: আপনি তখন কোথায় ছিলেন?

কামাল আহমেদ: তখন আমি ছিলাম ঢাকায়। এখানে বসেই সবার সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছিল।

মতিউর রহমান: তারপর?

কামাল আহমেদ: এর মধ্যে প্রায় ৪০ ঘণ্টা চলে গেল। একটা রাত চলে গিয়ে আরেক রাত চলে এল। ছাত্রীরা আবার চেষ্টা করল সাউথ গেট দিয়ে যেতে। এবার আর তালেবানরা ঢুকতে দিল না। আমাদের ড্রাইভারদের রাইফেলের বাঁট দিয়ে মারতে শুরু করল তারা। জিজ্ঞেস করল যে কেন তাঁরা ছাত্রীদের এখানে নিয়ে এসেছেন?
এরপরও আমরা হাল ছাড়ছিলাম না। সাউথ গেট দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করছি, এর মধ্যে ১০০ মিটারের কাছাকাছি দূরত্বে দুটি বোমা বিস্ফোরিত হলো। শিশুসহ অন্তত ১৭০ জন মারা গিয়েছিল এতে। মার্কিন সেনাবাহিনীর লোকও ছিল ১৩ জন। ড্রাইভাররা বেঁকে বসলেন এ সময়। তাঁরা ছাত্রীদের বললেন, ‘আমরা আর যাব না। তোমরা যেতে চাইলে এখানেই নেমে যাও। আমরা তোমাদের নিতে পারব না।’
এর মধ্যে একটি বাসে প্রায় ১৭ জন মানুষ জোর করে উঠে পড়তে চেষ্টা করল। তারা ভাবছিল, কোনোমতে যদি বাসে উঠতে পারে, তাহলে হয়তো আমাদের সঙ্গে এয়ারপোর্টে ঢুকে যেতে পারবে। এভাবে রাত প্রায় দুইটা বেজে গেল। হোয়াটসঅ্যাপে আমাদের যোগাযোগ চলছে। আমরা ছাত্রীদের বললাম, আজ আর চেষ্টা করব না। তোমরা ফিরে যাও।
এভাবে ২৫ আগস্ট পার হয়ে গেল।

default-image

মতিউর রহমান: এই যে বাস আসছে-যাচ্ছে, তালেবানরা কি এটা মেনে নিচ্ছে?

কামাল আহমেদ: তাদের পোস্ট থেকে যেতে দিচ্ছে। আমাদের ড্রাইভারগুলো ওভাবেই বাছাই করা ছিল। ওদের সঙ্গে আঞ্চলিক পর্যায়ে চেনাজানা আছে। তবে আমাদের কিন্তু সত্যিকার অর্থেই প্রস্তুতি ছিল যে অসুবিধা হতে পারে। আমরা পাকিস্তান হাইকমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। শুনেছিলাম, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের কর্মীরা যখন আফগানিস্তান ছেড়ে যান, তখন পাকিস্তান দূতাবাস থেকে তাঁদের আলাদা সহযোগিতা করেছিল। আমরা ভেবেছিলাম, পাকিস্তান দূতাবাস থেকে আমরাও সহযোগিতা পাব। কিন্তু একদম শেষ মুহূর্তে আমরা আর সে সহযোগিতা পাইনি। তখন আমরা কী করব, বুঝতে পারছিলাম না। থেকে গেলেও ঝুঁকি।
পরদিন ২৬ আগস্ট আমার দুটি বিষয় মনে হলো—একটি হলো মার্কিন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আমাদের অনেক বেশি অগ্রাধিকার পেতে হবে। তাদের সমর্থন পেলে আমরা ছাত্রীদের নিয়ে যেতে পারব। নইলে এয়ারপোর্টে গেলেও ঢুকতে দেবে না। তার ওপরে আর এক দিন আছে—২৭ আগস্ট, শুক্রবার—সেটিই ছিল বেসামরিক ব্যক্তিদের ফেরত আসার জন্য শেষ দিন। আরেকটি বিষয় হলো উচ্চপর্যায়ের তালেবানদের অনুমোদন ছাড়াও ওরা আমাদের যেতে দেবে না।
মার্কিন সরকারের সূত্রগুলোর সাহায্যে আমরা স্টেট ডিপার্টমেন্ট, হোয়াইট হাউস—অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারলাম। আমাদের বলা হলো যে আমরা হোয়াইট হাউস থেকে উচ্চ–অগ্রাধিকার পাব। ছাত্রীরা সবাই আফগানিস্তানের তরুণ নারী, প্রায় সবাই শিক্ষিত, তা ছাড়া বেশির ভাগই হাজারা বা শিয়া সংখ্যালঘু। ওখানে থেকে গেলে তারা তালেবানদের লক্ষ্যবস্তু হবে। এসব কারণেই তারা উচ্চ-অগ্রাধিকার দেবে।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এখন তালেবানদের কোথায় খুঁজে পাব? ওখানে তো আমাদের যোগাযোগ নেই, কোনো তালিকা নেই—যাদের সঙ্গে কথা বলতে পারি। আমরা আশরাফ গনি সরকারের যাঁদের সঙ্গে কাজ করতাম, তাঁদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করলাম।

default-image

মতিউর রহমান: সব আপনি এখানে বসেই করছেন?

কামাল আহমেদ: হ্যাঁ। শুধু ফোনে—হোয়াটসঅ্যাপ আর জুম। আশরাফ গনি সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল, এমন এক লোকের নাম তারা আমাদের দিল। সে আমাদের সাহায্য করতে পারবে। দুপুর ১২টার দিকে ওই লোককে ফোন করলাম আমরা। ভদ্রলোকের ছেলে ফোন ধরল। বলল, ‘বাবা মসজিদে চলে গেছে।’ ওদিকে বাস একটা থেকে বসে আছে রওনা হবে বলে।
তিনটা-সাড়ে তিনটা বেজে গেল, ওই লোক ফোন ধরে না, ফোন করেও না। এর মধ্যে আমাদের এক ছাত্রী ফোন করে জানাল, সে কাবুলের এক জায়গায় পার্টটাইম কাজ করছিল। তার বস নাকি কোনোভাবে এয়ারপোর্টে ঢুকতে পেরেছেন। সেখান থেকে তিনি ফোন করে জানিয়েছেন যে তাঁদের অফিসের ১৯ জন মানুষকে মেরে ফেলা হয়েছে। তিনি মেসেজ দিলেন যে গেলে এখনই যেতে হবে। নইলে সমস্যা হবে।
তখন আমরা আবার সব ছাত্রীকে জুমে আসতে বললাম। জিজ্ঞেস করলাম যে কী করব। আমরা শুধু এটা জানতাম যে আমেরিকানদের কাছ থেকে আমরা উচ্চ-অগ্রাধিকার পাব। কিন্তু একমাত্র আমেরিকান সাইডই যথেষ্ট নয়।
এর মধ্যে আমরা ফোন পেলাম। যে লোক জুমার নামাজ পড়তে গিয়েছিল, সে যোগাযোগ করল আমাদের সঙ্গে।

মতিউর রহমান: নাম কী তার?

কামাল আহমেদ: তার নামটা বলতে পারব না।

default-image

মতিউর রহমান: পরে বের করতে পেরেছেন?

কামাল আহমেদ: না। তো ওই লোকটি বলল, ‘তোমরা যাও।’ আমি জানতে চাইলাম যে কোনো সমস্যা হবে কি না। বলল, ‘কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারছি না, তবে যাও।’ আমরা ছাত্রীদের সঙ্গে আলাপ করে ঠিক করলাম যে আজ যাব, যেহেতু কাল থেকে বেসামরিক ব্যক্তিদের জন্য আর কোনো ফ্লাইট নেই।

default-image

মতিউর রহমান: কোনো প্লেন কি অপেক্ষা করছিল আপনাদের জন্য?

কামাল আহমেদ: না। প্লেন তো এক ঘণ্টা থেকে চলে যায়। এর মধ্যে পৌঁছাতে না পারলে আর কিছু করার নেই। তবে আমরা তখন আর প্লেনের কথা চিন্তা করিনি। আমাদের মাথায় আছে শুধু কোনোভাবে যদি এয়ারপোর্টে ঢুকতে পারি, তাহলে আমরা নিরাপদ। এয়ারপোর্ট হলো সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা।
রওনা হওয়ার ২০ মিনিট আগে দেখি, ২৫ জনের মতো ছাত্রী আসেনি। সম্ভবত তারা ভয় পেয়েছে বা ক্লান্ত হয়ে গেছে কয়েক দিনের হুড়াহুড়িতে। আগেও কত সময় এদের বাসে কাটাতে হয়েছে, আবার হয়তো ৪০ ঘণ্টার মতো বাসে বসে থাকতে হবে। এমনও হতে পারে যে তাদের পরিবার আর আস্থা পাচ্ছিল না।

মতিউর রহমান: বাসে কত টাকা দিতে হয়েছিল?

কামাল আহমেদ: প্রতি সিট ৮০০ ডলার করে নিয়েছে, যেখানে ট্যাক্সিতেও এয়ারপোর্ট পর্যন্ত যেতে ১০ ডলার লাগে না।

মতিউর রহমান: টাকাটা কি আপনি দিয়েছেন?

কামাল আহমেদ: না। এটা অন্য একজন সমর্থক দিয়েছে।

মতিউর রহমান: কে?

কামাল আহমেদ: একটি বন্ধু সংস্থা।

মতিউর রহমান: আপনাকে কিছুই দিতে হয়নি?

কামাল আহমেদ: না। একদমই না। বন্ধু সংস্থাটিই দিয়েছে।

মতিউর রহমান: নাম জানেন?

কামাল আহমেদ: না। তবে নামটা বলতে পারব আমি।

মতিউর রহমান: আচ্ছা। তারপর কী হলো?

কামাল আহমেদ: ২০ মিনিটের মধ্যে রওনা হতে হবে আমাদের, তখন দেখা গেল বাসের ২৫টি সিট খালি। তখন ওই সাত বাসের সাতজন নেতৃস্থানীয় ছাত্রীকে আমি বললাম যে তোমাদের যদি একই বয়সী কোনো বোন থাকে, তাদের নিয়ে এসো। অন্তত চেষ্টা করব। কোনো সিট খালি রেখে আমরা যাব না।
তখন কেউ তিনজন, কেউ দুজন বোন আনল। এভাবে ১৪৮ জন হলো। সমস্যা হলো, যারা এসেছে, তাদের মধ্যে তিনজনের কোনো পাসপোর্ট নেই। আমি তাদের সঙ্গে কথা বললাম। বললাম যে আমি তাদের জন্য চেষ্টা করতে পারি, কিন্তু কথা দিতে পারছি না। যদি না হয়, তাহলে কিন্তু তাদের নিজে নিজে ফেরত আসতে হবে। তারা রাজি হয়ে গেল। বাস আবার রওনা হলো।

default-image

মতিউর রহমান: কদিন লাগল তাহলে?

কামাল আহমেদ: পাঁচ দিনের বেশি।

মতিউর রহমান: যাওয়া-আসা মিলে?

কামাল আহমেদ: হ্যাঁ। তো আমরা রওনা হলাম। আবার এই গেট, ওই গেট। এর মধ্যেও আবার গোলমাল। যোগাযোগব্যবস্থা তো সীমিত। এ অবস্থায় এক জায়গায় বাস দাঁড়িয়েছে, সবকিছু ঠিকমতো চলছে, হঠাৎ করে ওরা জানাল, বাস যে লাইনে আছে, ওই লাইনে থাকবে না। পাশের লাইনে দাঁড়াতে হবে। পাশে আরেকটি লাইনে দাঁড়াতে হলো। আমরা ভয় পেয়ে গেলাম, কী হলো আবার?
তৃতীয় দিন আসলে একই রকম দেখতে অন্য বাস দিয়েছে—কোস্টার, কিন্তু লাইসেন্স অন্য বাসের। আমরা যে লাইসেন্স প্লেটের নম্বর সাবমিট করেছি আগে, এটার সঙ্গে মিলছে না। এই নিয়ে আরও দুই ঘণ্টা বাড়তি বসে থাকতে হলো। এভাবে সাড়ে পাঁচ দিনের দিন অবশেষে আমরা এয়ারপোর্টে ঢুকে পড়তে পারি।
যা-ই হোক, একটা অদ্ভুত জিনিস লক্ষ করলাম। বাইরে তো যুদ্ধ, কিন্তু বিমানবন্দরের ভেতরে একদম অন্য রকম দৃশ্য। তালেবানদের ডেস্কের পাশেই আমেরিকানদের ডেস্ক। তারা এয়ারপোর্টের ভেতরে যাচ্ছে-আসছে, তথ্য আদান-প্রদান করছে। এপাশে আমেরিকান কো-অর্ডিনেটর, ওপাশে তালেবান কো-অর্ডিনেটর—সবাই খুব ফরম্যাল ব্যবহার করছে একে অন্যের সঙ্গে। প্রথমে তালেবানদের কাছ থেকে অনুমোদন পেলাম। এরপর আমেরিকান অনুমোদনও পেলাম। এরপর আবার আরেকটা চেকপোস্ট। এটা এয়ারপোর্টের একদম ভেতরে। এটাই শেষ চেকপোস্ট। সেখানেও তালেবানরা অনুমোদন দিয়ে দিল। আমেরিকান ডেস্কে গেলে ওরা বলে পাসপোর্ট ছাড়া ওই তিনজনকে তারা ছাড়তে পারবে না। তাদের নাম তালিকায় নেই। তারা ওই তিনজনকে আটকে দিল।

মতিউর রহমান: কিন্তু তালিকায় তো আরও ২২ জনের নাম ছিল না।

কামাল আহমেদ: ওটা দেখেনি। কিন্তু যেহেতু এই তিনজনের পাসপোর্টই ছিল না, তাই ওদের আটকে দিয়েছে। এর মধ্যে বাকি ১৪৫ জন ভেতরে ঢুকে পড়ল। ঘণ্টাখানেক পর তাদেরও ছেড়ে দেয়। তারাও এয়ারপোর্টের ভেতরে ঢুকে যায়।

মতিউর রহমান: পাসপোর্ট ছাড়াই ছাড়ল?

কামাল আহমেদ: হ্যাঁ। অনেকবার ফোন করতে হলো। আরেকটা বিষয়, কেউ কোনো লাগেজ নিতে পারেনি। শুধু ফোন আর ফোনের চার্জার নেওয়ার অনুমতি ছিল।

মতিউর রহমান: আপনাদের তো তখন আর কোনো প্লেন নেই?

কামাল আহমেদ: প্লেন যেটা থাকার কথা ছিল, তিন-চার দিন আগেই চলে গেছে। যেহেতু আমরা উচ্চ-অগ্রাধিকার পেয়েছিলাম, তাই ছাত্রীরা একটি আমেরিকান মিলিটারি প্লেনে উঠে পড়তে পারে।

মতিউর রহমান: প্লেন ছিল ওখানে?

কামাল আহমেদ: হ্যাঁ। এমনিতে অনেক প্লেন আসা-যাওয়া করছে। তো একটি আমেরিকান মিলিটারি প্লেন ওদের উঠিয়ে নিল। এর মধ্যে একটা ব্যাপার ঘটল। তিনটি মেয়ে পাশের ঘরে গিয়েছিল তাদের ফোনে চার্জ দিতে।

মতিউর রহমান: কোন তিনটি মেয়ে? যাদের পাসপোর্ট ছিল না?

কামাল আহমেদ: না। অন্য তিনটি মেয়ে। আসলে ফোন তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তখন। আমরা ফোনেই সবার সঙ্গে যোগাযোগ করি। প্রত্যেক মেয়েকে বলে দিয়েছিলাম ফোনে ‘জিওকমিউনিকেশন্স’ নামের একটি অ্যাপ ডাউনলোড করতে, যেটা দিয়ে আমরা ঢাকায় বসে দেখতে পারছি কে কোথায় আছে। ফোনে চার্জ না থাকলে আমরা তাদের সঠিক অবস্থান দেখতে পাব না।
ফোন চার্জে রেখে মেয়ে তিনটি ঘুমিয়ে গেল। কয়েক দিন ঘুমায়নি তারা। এর মধ্যে অন্যরা প্লেনে উঠে গেল। তারা রয়ে গেল ওখানে। ওদিকে যখন সবাই প্লেনে উঠে গেল, আমরা বুঝতে পারছিলাম না প্লেন কোথায় যাবে। আমাদের কেউ বলেনি এটা কাতার যাবে না অন্য কোথাও। ড্যাশবোর্ড তো অন্ধকার হয়ে গেছে। এর মধ্যে ওই তিনটি মেয়ে ঘুম ভেঙে দেখে যে কেউ নেই। কী করবে তারা? কোথায় যাবে? আরেকটি আমেরিকান মিলিটারি প্লেনে চড়ে তারা কাতার চলে গেল। কাতারে নেমে দেখে যে ১৪৫ জনের কেউ কোথাও নেই।

মতিউর রহমান: ওই ১৪৫ জন কোথায় গেল?

কামাল আহমেদ: তারা চলে গেছে রিয়াদ—সৌদি আরবে। এদিকে কারও ফোনে রোমিং নেই, ওয়াই–ফাই নেই। তো ফরেন মিনিস্ট্রির সঙ্গে যখন ভিসার ব্যাপারে আলাপ হচ্ছিল, তারা বলেছিল, বাংলাদেশের প্রায় ১৫ জন কাবুলে আটকা পড়ে আছেন, কেউ ব্র্যাকে কাজ করে, কেউ টেলিকম ইঞ্জিনিয়ার—তাঁদের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে। তাঁদের একজনকে আমি ফোন করলাম। অপরিচিত ভদ্রলোক ফোন ধরে বললেন, ‘আমরা রিয়াদে এসেছি। সবাই ভালো আছে। মেয়েদের ঢুকতেই আলাদা করে দিয়েছে। ওরা কাছে নেই কিন্তু ভালো আছে।’ এই প্রথম জানলাম যে ওরা রিয়াদে পৌঁছেছে। এক দিন পর নিয়ে গেল স্পেনে। স্পেনে সম্ভবত দুই রাত ছিল। ওখান থেকে নিয়ে গেল ওয়াশিংটন ডালাস বিমানবন্দরে। সেখান থেকে ওয়েস্টার্ন উইসকন্সিন, বিরাট মিলিটারি বেস সেখানে। এখন সবাই ওখানেই আছে। একই জায়গায় আরও ১৩ হাজার আফগান শরণার্থী আছে।

মতিউর রহমান: তাদের আমেরিকা নিয়ে গেল কেন? বাংলাদেশে আসার কথা ছিল না?

কামাল আহমেদ: আসলে আমেরিকান বেসে ঢুকে গেলে বের করা খুব কঠিন।

মতিউর রহমান: ঠিক আছে। কিন্তু তারা আমেরিকা পর্যন্ত কেন গেল? পরে কি চট্টগ্রামে আসবে?

কামাল আহমেদ: না। ছাত্রীদের সঙ্গে আলাপ করে সিদ্ধান্ত হলো যে তারা আমেরিকাতেই পড়বে। যার যতটুকু পড়াশোনা বাকি আছে, ওখানে থেকেই শেষ করবে।

মতিউর রহমান: আমেরিকান সরকার কি তাদের শরণার্থী হিসেবে নিয়ে নিয়েছে?

কামাল আহমেদ: হ্যাঁ। এখন এক বছরের মধ্যে তাদের স্ট্যাটাসের জন্য একটা স্থায়ী আবেদন (পার্মানেন্ট অ্যাপ্লিকেশন) করতে হবে। প্রত্যেক ছাত্রীর জন্য আমরা একজন করে স্বেচ্ছাসেবী আইনজীবী পেয়েছি। যেহেতু তাদের কোনো অভিজ্ঞতা নেই আশ্রয়ের জন্য, ওই স্বেচ্ছাসেবী আইনজীবীরাই দেখবেন।
এর মধ্যে নানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রস্তাব আসতে লাগল। ব্রাউন ইউনিভার্সিটি থেকে ১০ জন নিতে চাইল, কর্নেল থেকে ২০ জন। প্রত্যেকের জন্য তারা আলাদা পে-ও করবে। এর মধ্যে অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটি বলল যে তারা সবাইকে নেবে। আর্থিক-মানসিক—যত সমর্থন দেওয়া দরকার, তারা দেবে। একটা মেয়ে আবার গর্ভবতী ছিল, তাকেও আলাদা করে সহযোগিতা করতে রাজি হয়েছে তারা। সবাই অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে চলে যাবে। সেখানেই তারা থাকবে এবং পড়বে।

মতিউর রহমান: আচ্ছা। পরে ওই তিনজনের কী হলো?

কামাল আহমেদ: ওরাও একই জায়গায় চলে এসেছে।

মতিউর রহমান: তাহলে এখন ওই ১৪৮ জন ছাত্রী মার্কিন নাগরিক হয়ে যেতে পারে?

কামাল আহমেদ: বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ হলে হয়ে যেতে পারে।

মতিউর রহমান: পড়াশোনার পর তারা কী করবে? তাদের পরিকল্পনা কী?

কামাল আহমেদ: পাঁচ দিন যেহেতু তাদের একটা ভয়াবহ চাপের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে, এ ছাড়া পরিবারের অন্যরাও এখনো বের হতে পারেনি, কখন কী হয়—এক অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে সবাই। তাই আমরা পরে তাদের কাছে একটি প্রস্তাব দিয়েছি। আমরা তাদের বলেছি যে নতুন একটা অরগানাইজেশন করব। যার যখন পড়াশোনা শেষ হবে, তখন সে পাকিস্তান, তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান—নানা জায়গার আফগান শরণার্থীশিবিরে যাবে। এসব জায়গায় আমরা নতুন নতুন স্কুল সেটআপ করব। সেখানে তারা তিন বছরের জন্য গিয়ে পড়াবে। প্রত্যেকেই রাজি হয়েছে।
আমরা এখন এই প্রকল্পের জন্য ইউএনএইচসিআরের সঙ্গে কাজ করছি।

মতিউর রহমান: আচ্ছা। আপনাকে অভিনন্দন এ রকম দারুণ একটা কাজের সঙ্গে থাকার জন্য।

কামাল আহমেদ: আসলে অভিনন্দন ছাত্রীদের। কোনো সমর্থন নেই, তবু এত কিছুর মধ্যেও তারা কত কিছু করেছে!

সাক্ষাৎকার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন