default-image

প্রথম আলো: সম্প্রতি জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বীর উত্তম খেতাব বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: আমি মনে করি, এটি শাসক দলের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের এ সিদ্ধান্ত
নেওয়ার কোনো এখতিয়ারই নেই। তাদের দায়িত্ব প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করা এবং রাষ্ট্র তাদের যে সুযোগ–সুবিধা দেয়, তা পাওয়ার ব্যবস্থা করা। সেনাবাহিনীর কোনো কর্মকর্তার খেতাব বাতিল করা তাদের কাজ নয়। তারা সেটি করতেও পারে না। খেতাব বাতিল করা হলে জিয়াউর রহমানের কোনো ক্ষতি হবে না, বরং যারা এই সিদ্ধান্ত নেবে তারা জাতির কাছে নিন্দিত হবে। জনগণের হৃদয়ে জিয়াউর রহমানের যে আসন, তা অম্লান থাকবে। জিয়া বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে যে প্রচার চালানো হচ্ছে, সেটি মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ১৯৭৭ সালে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ফারুক দেশে এসে যখন ষড়যন্ত্র করছিলেন, জিয়া তাঁকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিলেন।

রাজনীতিক এবং সাবেক সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা মিলে সম্প্রতি আপনারা কয়েকজন একটি বৈঠকে বসেছিলেন। এর নাম দিয়েছিলেন দোয়া মাহফিল। ঘটনাটির তাৎপর্য কী?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: আমার অবস্থান থেকেই বলি। ২০১৬ সাল থেকে আমি যে দলটি করি, সেই বিএনপিতে কাউন্সিল নেই, রাজপথে তাদের আন্দোলন নেই। বলতে গেলে একধরনের অলস দিন কাটাই। জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল মাঝেমধ্যে কর্মসূচি দেয়। ২০–দলীয় জোটের আরেক শরিক বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির নেতা মেজর জেনারেল (অব.) মুহাম্মদ ইব্রাহিম এ দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছিলেন। ৫০-৬০ জন এসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে শিক্ষক, আইনজীবীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ ছিলেন। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সেখানে গিয়েছিলাম।

আপনি তো পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে কীভাবে জড়িয়ে পড়লেন?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: ১৯৭১ সাল যারা দেখেনি, তারা বুঝতে পারবে না, সেই সময়টা কেমন ছিল। বাঙালি যে একটি সাহসী জাতি, সেটি তারা প্রমাণ করেছিল। আমি বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছি। আমার ব্যাটালিয়নে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা সবাই যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। একই সঙ্গে স্থানীয় তরুণেরাও যোগ দিয়েছিল। যশোর এলাকায় আমি ৬০০ সদস্যের একটি বাহিনী গড়ে তুলেছিলাম। এক মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল শত্রুর কামানের গোলা উপেক্ষা করে। আমাদের স্বাধীনতার প্রধান লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্র। কিন্তু এখন তো গণতন্ত্র নেই। আমাদের একটি স্বাধীন ভূখণ্ড আছে, কিন্তু মানুষের স্বাধীনতা নেই।

গণতন্ত্রহীনতা কি বর্তমান সরকারের আমলেই ঘটেছে, নাকি সব সরকারের আমলেই তা ছিল?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: সব সরকারের আমলেই কমবেশি নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। ১৯৭৩ সালের জাতীয় নির্বাচনে আমার বাবা আজাহারউদ্দিন আহমদকে মনোনয়নপত্র পেশ করতে দেওয়া হয়নি। তাঁকে ২৪ ঘণ্টা আটকে রাখা হয়। তারপরও কুমিল্লায় খন্দকার মোশতাক জিততে পারেননি। তাঁকে জিতিয়ে আনা হয়। বরিশালে মেজর জলিল, রাশেদ খান মেনন, টাঙ্গাইলে আলীম আল রাজী ভোটে জয়ী হলেও জোর করে তাঁদের হারিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

আপনি ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে কারচুপির কথা বললেন, ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের আমলেও তো কারচুপি হয়েছে।

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: জিয়াউর রহমানের হ্যাঁ/না ভোটে অনিয়ম হয়েছে। কিন্তু ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে পেরেছে। অনেক সাংসদকে জানি, যাঁদের জামানত দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না, তাঁরাও জয়লাভ করেছেন।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থান যারা ঘটাল, আপনি তো তাদের সঙ্গে ছিলেন না। খালেদ মোশাররফের সঙ্গে ছিলেন। ৩ থেকে ৭ নভেম্বরের পালাবদল সম্পর্কে কিছু বলুন।

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: আমার চাকরি ছিল ব্রিগেড কমান্ডার শাফায়াত জামিলের অধীনে। আমার কমান্ডারের নির্দেশেই ঘাতকেরা দেশত্যাগ করেছেন। শাফায়াত জামিল তাদের দেশ থেকে বের করে দিয়ে ঠিক কাজই করেছিলেন।

খালেদ-শাফায়াতরা সফল হতে পারলেন না কেন?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: খালেদ মোশাররফের বোকামির জন্যই উদ্যোগটা ব্যর্থ হলো। তাঁর কোনো রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ছিল না। তিনি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছিলেন। বিচারপতি সায়েম যে ভাষণ দেন, তার খসড়া আমারই করা। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। তার আগেই ৬ তারিখ রাতে তথাকথিত সিপাহি বিদ্রোহ হয়। এর জন্য দায়ী কর্নেল তাহের।

আপনার কি মনে হয় খালেদের হত্যাকাণ্ড একটি ষড়যন্ত্র?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: নিশ্চয়ই ষড়যন্ত্র। শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড যেমন ষড়যন্ত্র ছিল, তেমনি ছিল খালেদের হত্যাকাণ্ডও। একটি বৃহৎ শক্তি এর পেছনে ছিল। তখন স্নায়ুযুদ্ধের যুগ। ৭ নভেম্বরের ঘটনায় ১৩ জন নিরীহ সেনা কর্মকর্তা নিহত হলেন। তাঁরা স্লোগান দিলেন, ‘সিপাহি সিপাহি ভাই ভাই, অফিসারদের কল্লা চাই’। জিয়া কঠোর হাতে সে বিদ্রোহ দমন করেন। সেদিন তিনি শক্ত পদক্ষেপ না নিলে বাংলাদেশে আর্মি থাকত না।

আপনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। জাতীয় দলের খেলোয়াড় ছিলেন। কিন্তু রাজনীতিক হিসেবে নিজেকে কতটা সফল বলে মনে করেন?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: আমি ছয়বার সাংসদ নির্বাচিত হয়েছি। রাজনীতিক হিসেবে আমার জনপ্রিয়তা ১৯৯১ সালেই প্রমাণিত হয়েছে। আমার বিপক্ষে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। আমার দুটি থানা লালমোহন ও তজুমদ্দিন খুবই অবহেলিত। মেঘনার ভাঙন থেকে তজুমদ্দিনকে রক্ষা করেছি। আমার সময়ে সেখানে বিদ্যুৎ গিয়েছে। অনেক রাস্তাঘাট হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে আগেই পরিচয় ছিল। তাঁকে বলায় তিনি টাকা দিতেও রাজি হলেন। আমি এলাকায় পাঁচটি কলেজ করেছি বাবা-মায়ের নামে। অনেক স্কুল করেছি। আমার এলাকার মানুষ আমার প্রতি সন্তুষ্ট।

এখনকার রাজনীতি সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: সার্বিকভাবে মনে করি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভূলুণ্ঠিত করেছেন রাজনীতিকেরা। এখন চলছে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি। ক্ষমতায় থাকতে হবে কিংবা ক্ষমতায় যেতে হবে—এটাই একমাত্র লক্ষ্য; জনকল্যাণ নয়। আমি দলে ২২ বছর ধরে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান। আমি পদ চাই না, দলে সম্মান চাই। আমি বললাম, মার্চ মাসে কাউন্সিল করা হোক। কিন্তু নেতৃত্ব আমার কথায় গুরুত্ব দিয়েছেন বলে মনে হয় না। আমি মনে করি এটি অসম্মানজনক। আমি সংবাদ সম্মেলন করে যে বক্তব্য দিয়েছি, সেটি বিএনপির তৃণমূলের বেশির ভাগ নেতা-কর্মীর মনের কথা। দলে কথা বলার জন্য কাউন্সিলই সর্বোচ্চ ফোরাম।

বিএনপি এখন কে চালাচ্ছেন?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: আমি এতই নগণ্য যে জানি না যে কে দল চালাচ্ছেন। তবে অনুমান করি, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, দলের স্থায়ী কমিটির সঙ্গে আলোচনা করে।

আপনি দলের ভাইস চেয়ারম্যান। দলের কেন্দ্রীয় কমিটি সর্বশেষ কবে বসেছে?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: চার বছর আগে।

বিএনপির ১৯৯১-৯৬ মেয়াদের শাসনের সঙ্গে ২০০১-০৬-এর কোনো পার্থক্য দেখেন কি?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: ১৯৯১-৯৬ সালে বিএনপি সরকার অনেক ভালো ছিল। দুর্নীতির কোনো অভিযোগ ওঠেনি। মন্ত্রীরা যোগ্যতর ছিলেন। ২০০১-০৬ সালের মেয়াদে সেই সুনাম রাখা যায়নি। এর কারণ আপনারাও জানেন, দেশের মানুষও জানে। আমি বলতে চাই না। তবে এর কারণটা খতিয়ে দেখা উচিত। ২০১৮ সালে যেভাবে ভোট হলো, তাতে আমরা কিছু করলাম না। আমরা যদি ৩০০ প্রার্থী নির্বাচন কমিশনের দিকে পদযাত্রাও করতাম, মানুষ বুঝত আমরা প্রতিবাদ করছি, ভোট ডাকাতির নির্বাচন মেনে নিইনি।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের উপায় কী?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: দুঃশাসনের অবসান হবেই। সেই অবসান যদি ভোটের মাধ্যমে হয়, তাহলেই সেটি সবার জন্য মঙ্গলের। কিন্তু সেটি যদি পাকিস্তানের মতো তালেবান স্টাইলে হয়, তাহলে তো সেটি বাংলাদেশের জন্য অশনিসংকেত।

কিন্তু বাংলাদেশে এখন জঙ্গিবাদ তো অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে।

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: জঙ্গিবাদের উত্থানের আশঙ্কা খুব নেই। কিন্তু মিসর, তুরস্ক, আলজেরিয়া প্রভৃতি দেশে মৌলবাদী গোষ্ঠী তো ভোটের মাধ্যমেই ক্ষমতায় এসেছে। বিএনপি যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে বাংলাদেশেও তা ঘটতে পারে।

২০–দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামী বিএনপির আশীর্বাদ না বোঝা?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: বিএনপির একাই অগ্রসর হওয়া উচিত। কেননা, বহির্বিশ্বে জামায়াত সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা আছে। আমি মনে করি, নির্বাচনী সমঝোতা ছাড়া জামায়াতের সঙ্গে অন্য কোনো জোট হওয়া উচিত নয়।

বর্তমান সরকারের দাবি, তাদের আমলে দেশের প্রভূত উন্নতি হয়েছে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর কাজ করা হচ্ছে।

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: এসব তো কথামালার রাজনীতি। যদি একটি পদ্মা সেতু কিংবা দু-চারটি ফ্লাইওভার উন্নয়নের নিদর্শন হয়, তাহলে বলার কিছু নেই। দেখতে হবে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে কি না, বৈষম্য কমেছে কি না। ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা প্রকট। সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্য খাত গুরুত্বপূর্ণ। করোনার শুরুতে আমরা দেখলাম রোগীরা হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ভর্তি হতে পারছেন না। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নেই। শিক্ষার দিকে তাকিয়ে দেখুন। অটো পাস আর কোনো দেশে দেওয়া হয়নি। এ অবস্থায় কীভাবে পরীক্ষা নেওয়া যায়, তা নিয়ে চিন্তা করার লোকও নেই সরকারে। সবাই আসলে টাকা বানানোর ধান্ধায়। পাকিস্তান আমলে একজন স্নাতকের যে মান ছিল, আজকে তার মান কোথায় নেমে গেছে। এমনকি ১৯৭৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপাচার্যের সঙ্গে আজকের উপাচার্যদের তুলনা করুন। সমাজে তাঁরা অত্যন্ত সম্মানিত ছিলেন। এখন একেকজন উপাচার্য যুবলীগের নেতা হওয়ার জন্য উদ্‌গ্রীব।

প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: আপনাকে ধন্যবাদ।

বিজ্ঞাপন
সাক্ষাৎকার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন