default-image
অণুজীববিজ্ঞানী ড. সমীর কুমার সাহা বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথের অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং প্রধান। একই সঙ্গে তিনি চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক হিসেব দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রথম আলোর সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন করোনাভাইরাসের বর্তমান ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ পরিস্থিতি, এর সম্ভাব্য কারণ ও জনসচেতনতার বিষয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এ কে এম জাকারিয়া

প্রথম আলো: করোনা সংক্রমণ আবার বেড়ে যাচ্ছে। এর পেছনের কারণ কী? জনগণের অসচেতন আচরণ বা স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলার কারণেই কি এমন হচ্ছে?

সমীর কুমার সাহা: আমরা দেখতে পারছি যে নতুন করে সংক্রমণ বাড়ছে এবং এটা প্রতিদিনই বাড়ছে। গত কিছুদিনের পরিসংখ্যান বিবেচনায় নিলেই সেটা টের পাওয়া যাচ্ছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেন সংক্রমণ নতুন করে বাড়ছে? নানা কারণ থাকতে পারে। আমরা যে অসচেতন হয়ে পড়েছি, সেটা সম্ভবত সবচেয়ে বড় কারণ। করোনাভাইরাসের নতুন ধরনের কথা বলা হচ্ছে, বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের ধরন। সেটা বেশ কিছুদিন আগেই বাংলাদেশে পাওয়া গেছে। এই ইউকে ধরনের কারণেই সংক্রমণ বেড়েছে কি না, তা পরিষ্কার নয়। আপনারা দেখবেন যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়টি এখন আর কেউ মানছেন না। মাস্ক হয়তো অনেকে পরছেন, কিন্তু সেটা যথাযথভাবে পরছেন না। আর সামাজিক দূরত্ব রক্ষার বিষয়টি কেউ মানছেনই না। হাত ধোয়ার বিষয়টি এখন কতটুকু লোকজন পালন করছে, সেটা এক বড় প্রশ্ন। দেশে যেহেতু করোনাভাইরাস আছে, তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চললে সংক্রমণ বাড়াটাই স্বাভাবিক।

করোনাভাইরাসের নতুন ধরন বা যুক্তরাজ্যের ধরন বাংলাদেশে পাওয়া গেছে। এর সংক্রমণ ক্ষমতা অনেক বেশি বলে আমরা শুনেছি...

সমীর কুমার সাহা: বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে আমরা নানা ধরনের কথা শুনেছি। যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলের করোনাভাইরাসের ধরনের কথা আমরা জানি। যুক্তরাজ্যের সঙ্গে যেহেতু আমাদের আসা-যাওয়া রয়েছে, সেহেতু এই ধরন এখানে চলে আসবে এটাই স্বাভাবিক। যুক্তরাজ্যের ভাইরাসের ধরনটির সংক্রমণক্ষমতা বেশি, কিন্তু বাংলাদেশে তা একইভাবে কাজ করছে, এমনটি বলা যাচ্ছে না। এখন পর্যন্ত এমন কোনো দৃষ্টান্ত নেই, যে কারণে এটা বলা যাবে যে যুক্তরাজ্য ধরনের কারণে সংক্রমণ বেড়েছে। আসলে আমাদের দেশের কিছু ইউনিক দিক রয়েছে। আমাদের খাদ্যাভ্যাস ও দেশের বেশির ভাগ লোকজন যে জীবন-যাপন করে, সেটা এর কারণ হতে পারে। করোনা পরিস্থিতি যখন দেশে বিস্তার শুরু করেছে, তখন আমাদের মনে আছে যে একবার পোশাক কারখানা খোলা হয়েছে, আবার বন্ধ হয়েছে এবং আবার খোলা হয়েছে। পোশাকশ্রমিকেরা যেভাবে আসা-যাওয়া করেছেন, তাতে ব্যাপক সংক্রমণের আশঙ্কা করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। উন্নত দেশগুলোতে এমন কিছু হলে হয়তো পরিস্থিতি খারাপ হতো। আমরা আরও দেখেছি যে আমাদের সমাজে গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষের তুলনায় অপেক্ষাকৃত উচ্চবিত্ত জনগণের মধ্যে সংক্রমণ ও মৃত্যুহার বেশি।

বিজ্ঞাপন

আপনি কি বলতে চাইছেন আমাদের জনগণের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বেশি?

সমীর কুমার সাহা: সেটা হতে পারে। করোনাভাইরাস তো আমাদের দেশে আগে থেকেই রয়েছে। সমস্যা হচ্ছে নভেল করোনাভাইরাস নিয়ে। আমাদের জীবনযাপন দেখলে দেখা যাবে যে আমরা বড় হয়েছি পুকুরে দাপাদাপি করে, যেগুলো তেমন পরিচ্ছন্ন ছিল না। আমরা ময়লা ও মাটিতে খেলাধুলা করেছি, গোবর নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেছি। ফলে নানা ধরনের ভাইরাস মোকাবিলা করেই আমরা টিকে আছি। আবার আমাদের পরের প্রজন্ম দেখবেন যারা দেশে বাইরে জন্ম নিয়েছে, তাদের অনেকেই এক সপ্তাহের জন্য দেশে এসে নানা অসুস্থতায় পড়েন। এটা বলা যায় যে আমাদের পরিবেশ-পরিস্থিতি আমাদের কিছুটা হলেও প্রোটেকশন দিচ্ছে।

বর্তমানে যে কিট ব্যবহার করে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত করা হচ্ছে, যুক্তরাজ্যের যে নতুন ধরনটি বাংলাদেশে পাওয়া গেছে, তা কি একই কিটের মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব?

সমীর কুমার সাহা: আমাদের দেশে যে কিট ব্যবহার করা হয় তা দুটি জিনকে টার্গেট করে করা। কিছু কিট আছে, যেখানে তিনটি জিনকে টার্গেট করা হয়েছে। কোনো একটি জিন যদি নেগেটিভ হয় বা অনুপস্থিত থাকে, তখন জিন সিকোয়েন্সিং করে নতুন ধরন শনাক্ত করা হয়। ফলে বর্তমান কিটের ওপর ভিত্তি করে নতুন ধরনের বিষয়টি টের পাওয়া সম্ভব এবং সেটা নিশ্চিত হতে জিন সিকোয়েন্সিং করতে হবে। কিন্তু নভেল করোনাভাইরাস শনাক্ত করতে না পারার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

করোনাভাইরাসের আরও নতুন কোনো ধরন ছড়িয়ে পড়লে তখন কী হবে?

সমীর কুমার সাহা: পরে কী হবে, সেটা আগে বলা কঠিন। আমরা এখন আফ্রিকান ধরন ও ব্রাজিলিয়ান ধরনের কথা জানি। যুক্তরাজ্যের ধরন আমরা শনাক্ত করতে পেরেছি।

বাংলাদেশে টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে। যুক্তরাজ্যের ধরন বা নতুন কোনো ধরনের ক্ষেত্রে এই টিকার কার্যকারিতা কতটুকু থাকবে, সে ব্যাপারে কি কিছু নিশ্চিত করা সম্ভব?

সমীর কুমার সাহা: বাংলাদেশে এখন যে ধরন রয়েছে, তার ক্ষেত্রে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা কার্যকর। ইউকে ধরনের ক্ষেত্রেও কার্যকর। কারণ, যুক্তরাজ্যে এই টিকা দেওয়া হচ্ছে। তবে দক্ষিণ আফ্রিকার ধরনের ক্ষেত্রে এই টিকা কার্যকর হয়নি বলে আমরা জেনেছি। অন্য যে টিকাগুলো আছে, তা আর্থিক ও কারিগরি নানা বিবেচনায় ব্যবহার করা আমাদের জন্য কঠিন। এখন পর্যন্ত আমরা যেভাবে এগোচ্ছি, তা ঠিক আছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে জনসংখ্যার তুলনায় যথেষ্ট পরীক্ষা হয়নি। ফলে সংক্রমণের প্রকৃত সংখ্যা জানা কঠিন। তথ্য-উপাত্ত দ্বারা প্রমাণিত না হলেও অনেক বিশেষজ্ঞ অনানুষ্ঠানিকভাবে আমাদের বলেছেন যে দেশে জনসংখ্যার একটি বড় অংশ ইতিমধ্যেই সংক্রমিত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হওয়া থেকে বাংলাদেশ কত দূরে রয়েছে?

সমীর কুমার সাহা: দেশে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা কত সেটা আমরা সত্যিই জানি না। পরীক্ষা যেমন কম হয়েছে, তেমনি লক্ষণ না থাকায় অনেকে পরীক্ষা করানোর প্রয়োজন মনে করেনি। আমাদের অফিসের কথা বলতে পারি, যেখানে ৭০ জনের মতো কর্মী রয়েছেন। শুরুতে দু-একজন সংক্রমিত হওয়ায় আমরা সবার পরীক্ষা করিয়েছি। যাঁদের মধ্যে শুরুতে সংক্রমণ ধরা পড়েনি, এক সপ্তাহ পরপর আমরা পরীক্ষা করাতাম। আমরা দেখেছি পরীক্ষায় যাঁরা পজিটিভ হয়েছেন, এমন ৯০ ভাগের কোনো লক্ষণ ছিল না। ফলে দেশে একটা বড় জনগোষ্ঠী সংক্রমিত হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের কাছে যেহেতু প্রকৃত কোনো তথ্য নেই, তাই হার্ড ইমিউনিটি কবে হবে, তা বলা কঠিন।

বাংলাদেশে যে টিকা দেওয়া হচ্ছে, তা দুই ডোজে নিতে হচ্ছে। দুই ডোজ নেওয়া হলেই কি আমরা একজনকে কোভিড-১৯ ভাইরাস থেকে নিরাপদ বলতে পারব?

সমীর কুমার সাহা: আসলে এভাবে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলা কঠিন। টিকা দেওয়ার পর দুই-তিন বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করলে তারপর বলা যায় যে এই টিকা কার্যকর, নিরাপদ। এবং আমরা বুঝতে পারব যে অ্যান্টিবডি কত দিন কাজ করে। আমাদের দেশের আগে যেখানে টিকা কার্যক্রম শুরু হয়েছে, সেখানকার অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে ছয় মাস আগে টিকা নিয়েছেন এবং এখনো অ্যান্টিবডি কাজ করছে। এখন পর্যন্ত জানা যাচ্ছে যে দুটি ডোজের মধ্যে মাস দুয়েকের ব্যবধান থাকলে অ্যান্টিবডি ভালো কাজ করে। দুই ডোজ টিকা নেওয়া সম্পন্ন হওয়ার পর আমাদের পর্যবেক্ষণ করতে হবে, বাইরের দেশগুলো থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত বিবেচনায় নিতে হবে। তারপর আমরা সিদ্ধান্তে আসতে পারব।

জনগণের মধ্যে সম্ভবত একধরনের মহামারি ফ্যাটিগ চলে এসেছে। মনে হচ্ছে কেউ আর করোনা পরিস্থিতিকে মানতে চাইছেন না। এর বিপদ কতটুকু? একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে জনগণের প্রতি আপনার কী আবেদন থাকবে?

সমীর কুমার সাহা: আমাদের মধ্যে যদি ফ্যাটিগ চলে এসে থাকে, তবে সেটা খুবই বিপদের কথা। আমাদের আরও কিছুদিন ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে কঠোর হতে হবে। ইউরোপের দেশগুলোতে এখনো তা কার্যকর রয়েছে। টিকা দেওয়া হচ্ছে এবং একই সঙ্গে লকডাউন চলছে। টিকা দিয়ে একজনকে ভাইরাস থেকে সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে যদি লকডাউন বা স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মানা হয়, তবে ভাইরাস ছড়াতে পারবে না। আমাদের দেশে প্রথম দফা টিকা নেওয়ার পর অনেকেই মনে করছেন আর চিন্তা নেই। জনসমাগমে যাচ্ছেন এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছেন না। আমরা দেখছি আমাদের বৈঠকগুলো এখন আর ভার্চ্যুয়াল হচ্ছে না। দুই টিকা নেওয়ার মাঝখানের সময়ে খুবই সাবধানে থাকতে হবে। সেটা না করলে এবং প্রথম দফা টিকা নেওয়ার পর করোনায় আক্রান্ত হলে টিকা কার্যক্রমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। টিকা কার্যক্রম চলার সময় সংক্রমণ বাড়লে জনগণের মধ্যে ভুল বার্তা যেতে পারে। জনগণের প্রতি আমার আহ্বান, আরও অন্তত দু–তিন মাস কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন।

প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।

সমীর কুমার সাহা: আপনাকেও ধন্যবাদ।

সাক্ষাৎকার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন