default-image

প্রথম আলো: করোনার প্রথম ঢেউয়ের ধাক্কা না সামলাতেই দ্বিতীয় ঢেউ এল। সরকার প্রথমে সাত দিন, পরে আরও আট দিন লকডাউন দিয়েছে। অর্থনীতিতে এর কী রকম প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন?

আহসান এইচ মনসুর: যেকোনো লকডাউন অর্থনীতির জন্য বিরাট ক্ষতি। কিন্তু অত্যাবশ্যক বলেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লকডাউন দেওয়া হয়েছে। করোনা সংক্রমণ যেভাবে বেড়ে চলেছে, তাতে আমাদের এখানেও লকডাউন দেওয়া সংগত বলে মনে করি। আবার জীবন-জীবিকাও একেবারে বন্ধ করা যাবে না। রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানা, ব্যাংক খোলা রাখা হয়েছে। কৃষি উপকরণ সরবরাহও চালু থাকবে। সীমিত পর্যায়ে বাজার খোলা আছে। রেস্তোরাঁ থেকে খাবার সরবরাহও বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য। এতে রেস্তোরাঁয় মানুষ ভিড় করবেন না। আমার ধারণা, সরকার লকডাউনের ক্ষেত্রে আন্তজেলা পরিবহন বন্ধ রেখে যে রিওরিয়েন্টেশন করেছে, তা কাজে দেবে। কিন্তু সমস্যা হলো আট দিন লকডাউন যথেষ্ট কি না। আমার ধারণা, এটি অন্তত ১৫ দিন করলে করোনার প্রাদুর্ভাব অনেকটা কমে যাবে।

প্রথম আলো: করোনার যে দ্বিতীয় ঢেউ এল, সে সম্পর্কে সরকারের প্রস্তুতি কতটা ছিল?

আহসান এইচ মনসুর: একেবারেই প্রস্তুতি ছিল না। করোনা সম্পর্কে জনগণকে সজাগ করার কথা সরকারের। কিন্তু আমরা দেখেছি সরকারি অনুষ্ঠানগুলোতে অনেক লোকের ভিড়। করোনার মধ্যেই বিভিন্ন স্তরের নির্বাচন করা হলো। পর্যটনের ক্ষেত্রেও লোকসমাগম সীমিত করা উচিত ছিল। বিশেষ করে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে। আমাদের এখানে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এসেছে বিলম্বে। সরকার প্রস্তুতির সময় পেয়েছিল।

প্রথম আলা: লকডাউনে অর্থনীতিতে যে ক্ষতি হলো, তা পুষিয়ে নেওয়ার উপায় কী?

আহসান এইচ মনসুর: করোনার প্রথম ঢেউয়ের ধাক্কা কাটিয়ে যখন অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করল, তখনই দ্বিতীয় ঢেউ এল। লকডাউন দিতে হলো। আমাদের আশা ছিল জুন-জুলাইয়ে অর্থনীতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে। ২০১৯-এর অবস্থায় ফিরে আসবে। কিন্তু এখন আর সেটি সম্ভব হবে না। আট দিনের লকডাউন মোটামুটি কড়াকড়িভাবে হচ্ছে। এটি বজায় রাখতে পারলে সংক্রমণ কমে আসবে। সংক্রমণ কমে এলে অর্থনৈতিক কার্যক্রম ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে আশা করা যায়। সমস্যা হলো, করোনা মোকাবিলার প্রধান যে খাত স্বাস্থ্যসেবা, সেখানে গত এক বছরে সক্ষমতা বাড়েনি। রোগীর শয্যা, আইসিইউ বাড়েনি। বরং দুর্নীতি বেড়েছে। বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে যে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল, তা-ও তারা খরচ করতে পারেনি। যেখানেই ব্যয় করতে গেছে, অনিয়মের কারণে আটকে গেছে।

বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো: সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির দুই হাজার কোটি টাকা পড়ে আছে বলে প্রথম আলোয় খবর বেরিয়েছে। কীভাবে ও কাকে বিতরণ করা হবে, সে বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না। এই সমস্যা আপনি কীভাবে দেখছেন?

আহসান এইচ মনসুর: করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সহায়তায় সরকারের পক্ষ থেকে বড় কোনো কর্মসূচিই নেওয়া হয়নি। ৫০ লাখ পরিবারকে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়ার যে পরিকল্পনা সরকার নিয়েছিল, তা-ও যথাযথভাবে বিতরণ করতে পারেনি। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা না নিলে গরিব মানুষগুলো আরও বেশি বিপদে পড়বে। সরকারের উচিত ছিল লকডাউনের আগেই কাজ হারানো গরিব মানুষের কাছে শুকনা খাবার পৌঁছে দেওয়া। তাহলে তাঁরা গ্রামে যাওয়ার জন্য বাসে, ট্রেনে, ফেরিঘাটে ভিড় করতেন না।

প্রথম আলো: যেকোনো জনহিতকর কর্মসূচির তালিকা নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত উপকারভোগীরাই বঞ্চিত হন। এর প্রতিকার কী?

আহসান এইচ মনসুর: সরকার পুরোপুরি আমলানির্ভর হয়ে পড়েছে। লকডাউন পরিস্থিতি মোকাবিলার দায়িত্বও দিয়েছে আমলাদের। জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করেনি। তারা নির্ভুল তালিকা কীভাবে করবে? এ প্রসঙ্গে পাকিস্তান আমলের একটি ঘটনা মনে পড়ল। একবার বন্যা হলে আইয়ুব খান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খানকে বললেন, সাত দিনের মধ্যে তালিকা পাঠাও। গভর্নর সচিবকে বললেন ছয় দিনের মধ্যে তালিকা পাঠাও। সচিব ডেপুটি কমিশনারদের বললেন, পাঁচ দিনের মধ্যে তালিকা পাঠাও। ডেপুটি কমিশনার এসডিওদের বললেন, চার দিনের মধ্যে তালিকা পাঠাও। এসডিও সার্কেল অফিসারদের বললেন, তিন দিনের মধ্যে তালিকা পাঠাও। সার্কেল অফিসার ইউপি চেয়ারম্যানকে বললেন, দুই দিনের মধ্যে তালিকা পাঠাও। এ অবস্থায় কী ধরনের তালিকা হতে পারে, সহজেই অনুমেয়। আমাদের আমলারা সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছেন বলে মনে হয় না।

প্রথম আলো: করোনার প্রাদুর্ভাব সত্ত্বেও গত এক বছরে রপ্তানি আয় ও প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ মোটামুটি ঠিক ছিল। সামনে বিপদ দেখছেন কি?

আহসান এইচ মনসুর: প্রবাসী আয় বাড়ার আসল রহস্যটা অনুধাবন করতে হবে। গত এক বছরে প্রবাসীদের আয় মোটেই বাড়েনি। বরং কমেছে। তিন-চার লাখ লোক চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। অনেক প্রবাসী শ্রমিক দুর্যোগের কারণে দেশে পরিবারের কাছে যথাসম্ভব বেশি টাকা পাঠিয়েছেন। বেশ কয়েক মাস ধরে বন্যা হলো, সে কারণেও অনেকে টাকা পাঠিয়েছেন। করোনাকালে বিদেশে অর্থ পাচারের পরিমাণ কমেছে। সেখানেও বাড়ি বেচাকেনা বন্ধ আছে। বিদেশের ব্যাংকে টাকা রাখলে কোনো লাভ নেই। এক পয়সা পাওয়া যায় না। আমাদের এখানে এখনো ৪-৫ শতাংশ সুদ পাওয়া যায়। সঞ্চয়পত্র কিনলে ১১-১২ শতাংশ। এ কারণেও প্রবাসীরা বিদেশে সঞ্চিত অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন। রপ্তানি খাত সম্পর্কে আমি আশাবাদী। বিশেষ করে তৈরি পোশাক। গত মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিতে ৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। উন্নত দেশগুলো করোনার ধাক্কা কাটিয়ে উঠছে। সে ক্ষেত্রে সেখানে পণ্যের চাহিদাও বাড়বে।

প্রথম আলো: করোনাকালে কেমন বাজেট হওয়া উচিত? কোন কোন বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া উচিত বা কোন কোন বিষয় পরিহার করা দরকার বলে মনে করেন?

আহসান এইচ মনসুর: আমাদের এখানে সব সময় অবাস্তব বাজেট করা হয়। সরকারকে বলব গত বছর থেকে শিক্ষা নিন। বাস্তববাদী হন। যে বাজেট বাস্তবায়ন করা যাবে না, সেটি প্রণয়ন করে লাভ কী? অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে ভার্চ্যুয়াল বৈঠকেও একই কথা বলেছি। বাজেট ঘাটতি ৫ শতাংশ দেখানো হয়। এ বছর এটি অন্তত ৭-৮ শতাংশ হওয়া প্রয়োজন। গত ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত বাজেট বাস্তবায়িত হয়েছে ৩২ শতাংশ। বাজেট অবশ্যই বাস্তবসম্মত হতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তার আওতা ও বরাদ্দ বাড়াতে হবে। অপ্রয়োজনীয় বা কম প্রয়োজনীয় প্রকল্প বাদ দিতে হবে।

প্রথম আলো: প্রবৃদ্ধি বাড়লে দেশে কর্মসংস্থান বাড়ার কথা। আমাদের প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, কিন্তু কর্মসংস্থান তো বাড়ছে না। আপনার বিশ্লেষণ কী?

আহসান এইচ মনসুর: এটা তো বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ না বাড়াতে পারলে বেকার সমস্যার সমাধান নেই। আমরা দেশি কিংবা বিদেশি কোনো বিনিয়োগই আকৃষ্ট করতে পারছি না। করোনাকালে এই সংকট আরও বাড়ছে। প্রতিবছর আমাদের দেশে ২২ লাখ নতুন মানুষ চাকরির বাজারে আসছে। আমরা জোগান দিতে পারছি খুব বেশি হলে ১৩ লাখ। বাকি ৯ লাখ মানুষ কোথায় যাবে?

প্রথম আলো: দক্ষ কর্মশক্তির জন্য প্রয়োজন যুগোপযোগী শিক্ষা। কিন্তু দেশের শিক্ষা খাত কি তা সরবরাহ করতে পারছে?

আহসান এইচ মনসুর: পারছে না। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। শিক্ষা খাত নিয়ে তেমন আলোচনাও হয় না। অমরা এক বছর ধরে ছেলেমেয়েদের ঘরে বসিয়ে রেখেছি। এদের একটা অংশের পড়াশোনা চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে। বিশেষ করে মেয়েদের। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অনেক উল্টাপাল্টা কাজ করেছেন। কিন্তু তিনি একটি সঠিক কথা বলেছিলেন। স্কুলটা শুরু করে দাও। জো বাইডেন এসেও একই কথা বলছেন। আর আমরা পুরো একটি বছর নীরব থাকলাম করোনার অজুহাত দেখিয়ে। গ্রামাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিলে কী সমস্যা হতো? খোলা মাঠেও ক্লাস হতে পারত। প্রত্যন্ত অঞ্চলে তো করোনা ছড়ায়নি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া সবই তো খোলা ছিল। হাটবাজার চলেছে।

বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো: আপনি যেহেতু একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান, সে কারণেই প্রশ্নটি করছি। আমাদের ব্যাংক খাত কি ঠিকমতো চলছে?

আহসান এইচ মনসুর: ব্র্যাক ব্যাংকের অবস্থা ভালো। কিন্তু সার্বিকভাবে ব্যাংকিং খাতের অবস্থা ভালো নয়। আগে থেকে অনেক ব্যাংক নাজুক অবস্থায় ছিল। করোনার কারণে আরও নাজুক হয়েছে। এ ক্ষেত্রে একটা কথা বলব, ব্যাংকের বোর্ড বা পর্ষদ যদি ভালো হয়, তাহলে ব্যাংকও ঠিকঠাকমতো চলে। অনেক ব্যাংকের বোর্ডেই সমস্যা আছে। আবার বিভিন্ন ব্যাংকের বোর্ড মেম্বারদের মধ্যে আঁতাত থাকে। এভাবে চললে ব্যাংকিং খাতে মন্দ ঋণ বাড়বেই।

প্রথম আলো: গত বছরে শিল্পকারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্য চালু রাখতে সরকার যে প্রণোদনা দিয়েছিল, তা অর্থনীতিকে কতটা চাঙা রাখতে পেরেছে?

আহসান এইচ মনসুর: সরকারের এই কর্মসূচি ঠিকই ছিল। কিছু বৈসাদৃশ্য আছে। সরকার প্রণোদনা দিয়েছে পুরোটা ব্যাংকের কাঁধে বন্দুক রেখে। ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার কথা ছিল। তৈরি পোশাকশিল্পসহ বড় উদ্যোক্তারা মোটামুটি পেয়েছেন। কিন্তু ছোট উদ্যোক্তারা পাননি। ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য বরাদ্দও খুব কম ছিল। মাত্র ২০ হাজার কোটি টাকা।

প্রথম আলো: অভিযোগ আছে, ব্যাংকগুলো ছোট উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে আগ্রহ দেখায়নি।

আহসান এইচ মনসুর: আমরা কিন্তু দিয়েছি। সব ব্যাংক ক্ষুদ্রঋণ দেওয়ার জন্য যথাযথভাবে সংগঠিত নয়। ব্র্যাক ব্যাংকের এই সাংগঠনিক সক্ষমতা আছে বলে পেরেছে। আমাদের প্রথম বলা হয়েছিল ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা দিতে। আমরা দিয়েছি। এরপর আরও দুই দফায় ২০০ কোটি টাকা করে ঋণ দিয়েছি। আইডিএসও দিয়েছে। কিন্তু অনেক ব্যাংক ও এনজিও ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দিয়ে পোষাতে পারবে না। এ কারণেও তারা আগ্রহ দেখায়নি।

প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।

আহসান এইচ মনসুর: আপনাকেও ধন্যবাদ।

সাক্ষাৎকার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন