বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো: লিবিয়া থেকে ইউরোপে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরের তিউনিসিয়া উপকূলে আরও ১৭ জন বাংলাদেশি ডুবে মারা গেছেন। এর আগেও সাগরে ডুবে অনেক বাংলাদেশি মারা গেছেন। অনেক বাংলাদেশি নাগরিককে উদ্ধার করে রেডক্রসের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে। তঁাদের উদ্ধার করে দেশে ফেরত আনা যাবে কীভাবে?

তাসনীম সিদ্দিকী: ইউরোপে অভিবাসনের স্বপ্ন পূরণ করতে আবারও প্রাণ হারালেন ১৭ জন বাংলাদেশি তরুণ। এ ছাড়া রেডক্রসের তত্ত্বাবধানে কোভিড টেস্ট করে কোয়ারেন্টিনে আছেন ৩৮০ জন, যাঁদের অনেকেই বাংলাদেশি। আইওএমের হিসাব অনুযায়ী এ বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ভূমধ্যসাগরে জাহাজডুবিতে সলিলসমাধি হয়েছে ৭৬০ জন অভিবাসীর। যাঁরা এ যাত্রা প্রাণে বেঁচে গেছেন, তঁাদের ফিরিয়ে আনতে হলে দূতাবাসকর্মীদের প্রথমে অভিবাসীদের জাতীয়তা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। তারপর আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন আইওএম অথবা ইউএনএইচসিআরের সহযোগিতা চাইতে হবে। তবে সবার আগে নিশ্চিত হতে হবে তাদের কতজন দেশে ফিরে আসতে রাজি। অতীতে দেখা গেছে দেশে ফেরার পরে তাঁদের অনেককে জেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। দেশে আনার আগে এ নিশ্চয়তা দিতে হবে যে তাঁদের জেলে পোরা হবে না।

প্রথম আলো: করোনা মহামারির মধ্যে এ ধরনের অভিবাসন বাড়ার কারণ কী? যে প্রক্রিয়ায় এঁদের বাংলাদেশ থেকে নেওয়া হচ্ছে তাকে কী বলবেন? অভিবাসন, না মানব পাচার?

তাসনীম সিদ্দিকী: বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, যেকোনো সংকটকালে অনিয়মিত অভিবাসন বেড়ে যায়। পাচারকারী চক্র এই সুযোগটা নিয়ে অনিয়মিত পথে অভিবাসনের সুযোগ করে দেয়। বলা বাহুল্য, ব্যাপক অর্থের বিনিময়ে। ইদানীং মানব চোরাচালান, মানব পাচার এবং অনিয়মিত অভিবাসনের মধ্যে যে সূক্ষ্ম ফারাক, তা আর লক্ষ করা যাচ্ছে না। তবে ইউরোপে যে অভিবাসনের স্রোত, তাকে আমি এখনো মানব চোরাচালানই বলব। কারণ, চোরাচালানকারীদের দায়িত্ব সীমা পার করে দেওয়া। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পৌঁছানোর পর অভিবাসীদের সঙ্গে চোরাকারবারিদের আর সম্পর্ক থাকে না।

প্রথম আলো: অবৈধ অভিবাসনপ্রক্রিয়ার সঙ্গে দেশি ও বিদেশি চক্র জড়িত। মানব পাচারের আন্তর্জাতিক চক্রের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া যাবে কীভাবে?

তাসনীম সিদ্দিকী: ড্রাগ ও অস্ত্র পাচারের পরে বিশ্বে তৃতীয় বৃহত্তম আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যবসা হচ্ছে মানব পাচার। এর চক্র আছে বিশ্বজুড়ে। এক দেশের পাচারকারীর সঙ্গে আরেক দেশের পাচারকারী চক্রের যোগাযোগ থাকলেও এটি একক কোনো গোষ্ঠী নয়। এদের ধরা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। এ জন্য দরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

প্রথম আলো: মানব পাচার বন্ধে দেশে যে আইন আছে, সেটি আন্তর্জাতিক মানের বলেই অনেকে মনে করেন। সরকার মানব পাচার বন্ধে আলাদা আদালতও গঠন করেছে। কতটা কার্যকর হয়েছে?

তাসনীম সিদ্দিকী: ২০১২ সালে বাংলাদেশে পাচারের বিরুদ্ধে শক্ত আইন হয়েছে এ কথা সত্য, কিন্তু বিশেষ আদালতগুলো এখনো সব গড়ে ওঠেনি। বিধি তৈরি হয়েছে মাত্র ২০১৭ সালে। ৬ হাজারের ওপরে মামলা রুজু হয়েছে, তবে শাস্তি পেয়েছে ১০০ জনের কম। আবার এরা সব চুনোপুঁটি। প্রমাণের অভাবে ছাড়া পেয়ে যায় অনেকে, আর গডফাদাররা থাকে অন্তরালে।

প্রথম আলো: অনেক দেশ মধ্যপ্রাচ্যে নারী কর্মী পাঠানো বন্ধ করেছে। সেখানে গিয়ে তঁারা নিগৃহীত হন এই অভিযোগে। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে নারী কর্মীদের পাঠানো হচ্ছে। অনেক নারী নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফেরত আসছেন। বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?

তাসনীম সিদ্দিকী: বিশ্বায়ন বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে শোষিত–বঞ্চিত নারীদের জন্য চাকরিতে এবং নিজেকে বদলে দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। একই সঙ্গে এই বিশ্বায়নই তাঁকে নিরাপত্তাহীন, শ্রম অধিকারহীন এক কর্মজীবন দিয়েছে। নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে কার্যকর কিছু করতে হলে বিভিন্ন বহুপাক্ষিক ফোরামে এ নিয়ে দাবি তুলতে হবে। গৃহকর্মী–সংক্রান্ত আইএলওর যে কনভেনশন রয়েছে, তাতে স্বাক্ষর করার জন্য গ্রহণকারীর দেশগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগ করতে হবে। তবে নারী অভিবাসনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা উচিত হবে না। কারণ, এতে নারীদের সুরক্ষা আরও কমে যাবে। নারী পাচার কার্যক্রম আরও বেড়ে যেতে পারে।

প্রথম আলো: বাংলাদেশ থেকে ভারত ও পাকিস্তানেও নারী পাচারের ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি বেঙ্গালুরুতে নারী পাচার চক্র ধরা পড়ার পর জানা গেল, সেখানে অনেক বাংলাদেশি নারী আছেন। তাঁদের উদ্ধার ও পাচার বন্ধ করার উপায় কী?

তাসনীম সিদ্দিকী: ভারত ও পাকিস্তানে নারী পাচারের ঘটনা দীর্ঘদিনের। এ ক্ষেত্রে নারীদের উদ্ধারে পাচারবিষয়ক সার্ক কনভেনশন ব্যবহার করা যেতে পারে। তা ছাড়া ভারতে অবস্থানরত দূতাবাসকর্মীদের ‘রি–অ্যাকটিভ’ না হয়ে ‘প্রো–অ্যাকটিভ’ হয়ে কাজ করতে হবে।

প্রথম আলো: করোনাকালেও প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের পরিমাণ বেড়েছে। এর কারণ কী?

তাসনীম সিদ্দিকী: দীর্ঘদিন ধরে আমাদের প্রতিষ্ঠান রামরু বলে আসছে যে রেমিট্যান্স বাংলাদেশের একটি ৩০ বিলিয়ন ডলারের ইন্ডাস্ট্রি। এর অর্ধেক আসে নিয়মিত পথে আর বাকি অর্ধেক হুন্ডি হয়ে। গত বছর ২১ বিলিয়ন ডলার নিয়মিত পথে এসেছে এই কারণে যে, যেসব ক্ষেত্রে হুন্ডির টাকা প্রয়োজন যেমন পোশাক কারখানাসহ অন্যান্য ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে ওভার ও আন্ডার ইনভয়েসিং করা; রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর ভিসা কেনায় খরচ করা বা স্বর্ণ চোরাচালানকারীদের ব্যবস্থা, সেগুলো গত বছরে মন্থরগতিতে চলেছে। ফলে হুন্ডির চাহিদা ছিল না। অর্থাৎ রেমিট্যান্স বৃদ্ধি দেখে ভাবার কারণ নেই যে বাংলাদেশের শ্রমিকেরা করোনাকালে অর্থনৈতিকভাবে ভালো আছেন।

প্রথম আলো: বিদেশ থেকে ফেরত আসা প্রবাসীদের জন্য সরকার যে সহায়তা কর্মসূচি নিয়েছে, তাকে কি যথেষ্ট মনে করেন? এ দুর্যোগে যাঁরা বিদেশে কাজ হারিয়েছেন, তঁাদের জন্য আন্তর্জাতিক মহলেরও কি কিছু করার ছিল না?

তাসনীম সিদ্দিকী: কোভিড-১৯–এর কারণে চার লাখ কর্মী গত বছর দেশে ফিরেছেন। সরকার তাঁদের পুনর্বাসনের জন্য ৭০০ কোটি টাকা ঋণদান প্রকল্প গ্রহণ করেছে। কিন্তু এ ঋণ গ্রহণে অভিবাসীরা তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। কারণ হিসেবে তাঁরা জানান, তাঁরা উদ্যোক্তা নন। আসলে তাঁদের আত্মকর্মসংস্থানে উৎসাহিত করতে হলে, ‘মার্কেট ওরিয়েন্টেড’ বিজনেস মডেল তৈরি করে দিতে হবে, ট্রেনিং দিতে হবে। তবেই তাঁরা ঋণ নিতে উৎসাহ হবেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি বড় দায় হচ্ছে করোনাকালে গ্রহণকারী দেশে অভিবাসীদের যে মজুরি চুরি গেছে, তা ফেরত পেতে সহায়তা করা। রামরুর সম্প্রতি গবেষণা থেকে দেখা যায় যে ফিরে আসা অভিবাসীরা গড়ে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকার মতো মজুরি এবং অন্যান্য ভাতা না নিয়ে দেশে ফিরেছেন। গ্রহণকারী দেশের সরকারগুলোর সঙ্গে বহুপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে এ টাকা ফিরে পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে হবে।

প্রথম আলো: বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে গেলে বাংলাদেশের শ্রমিকদের বিদেশে কাজ পেতে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। আবার সরকারি উদ্যোগে শ্রমিক পাঠানোর উদ্যোগও কম ক্ষেত্রে সফল হয়েছে। সে তুলনায় ভারত, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের শ্রমিকেরা কম খরচে বিদেশে যেতে পারেন। এর প্রতিকার কী?

তাসনীম সিদ্দিকী: বোয়েসেল আমাদের সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি। তারা মূলত দক্ষ কর্মী পাঠায়। তাদের বিরুদ্ধে প্রতারণার কোনো অভিযোগ নেই। দুর্ভাগ্যবশত তারা ১ শতাংশের মতো কর্মী নিয়োগ দিতে সক্ষম হয়েছে। বাকি কর্মীরা বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি এবং অভিবাসীদের ব্যক্তগত উদ্যোগে বিদেশে যাচ্ছেন। বোয়েসেলের কর্মক্ষমতা বাড়াতে হলে তাকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। এর বাজেট বাড়াতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে শ্রম অভিবাসনের খরচ সবচেয়ে বেশি। বিবিএসের হিসাবমতে একজন শ্রমিক বিদেশে যেতে ব্যয় করেন পাঁচ হাজার ডলার। এর কারণ রিক্রুটিং এজেন্সির কিছু কিছু মালিক, সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং তঁারা পার্লামেন্টে রয়েছেন। তাঁদের দায়বদ্ধ করার সুযোগ এই ছোট কলেবরের মন্ত্রণালয়ের নেই।

প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।

তাসনীম সিদ্দিকী: আপনাকেও ধন্যবাদ।

সাক্ষাৎকার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন