default-image

প্রথম আলো: করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সরকার কতটা সফল, কতটা ব্যর্থ?

এম এ মান্নান: করোনা মোকাবিলায় অবশ্যই আমাদের সাফল্য আছে। পাশ্চাত্যের তুলনায় আমাদের এখানে করোনায় আক্রান্তের হার কম। মৃত্যুর সংখ্যাও কম। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইংল্যান্ডের তুলনায় আমরা বেশ ভালো করেছি। এমনকি আশপাশের দেশের তুলনায়ও। করোনা শনাক্তের প্রথম দিকে আমাদের প্রধানমন্ত্রী কিছু সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কারখানাগুলো বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু বাজারব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে পরিবহনব্যবস্থা সচল রেখেছেন। কৃষি যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য বীজ, সার ও ঋণ বিতরণ নিশ্চিত করেছেন। কৃষিশ্রমিকের চলাচলও অব্যাহত ছিল। এ সিদ্ধান্ত বিরাট কাজে এসেছে। তারপর এক লাখ কোটি টাকার বেশি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হলো। আমাদের মতো অর্থনীতিতে এটা বিরাট সহায়ক হয়েছে। প্রণোদনার প্যাকেজ দেখে সবার মধ্যে আস্থা ফিরে এল যে সরকার তাদের পাশে আছে। অতি দরিদ্রদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার করা হলো। আরেকটি সিদ্ধান্ত ছিল, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ৫০ লাখ পরিবার বা দুই কোটি মানুষকে আড়াই হাজার টাকা করে নগদ বিতরণ। ধরে নিলাম ১০ শতাংশ এদিক–সেদিক হয়েছে। তারপরও বাকিটা তো গেছে। এটা অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে বড় ধরনের সহায়তা করেছে।

করোনার টিকা আমদানি নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত মানুষ টিকা পাবে কি?

এম এ মান্নান: অনেকের মনে প্রশ্ন ছিল আমরা টিকা পাব কি না। আমাদের দুর্ভাগ্য যে পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গে কিছু করতে গেলেই অনেকের মধ্যে সংশয় দেখা যায়। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এটা ঠিক নয়। তবে সংশয়ের কারণও আছে। এটা অস্বীকার করা যাবে না। তাদের দিক থেকে কিছু কথাবার্তার মধ্যে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছিল। তারা বলেছিল, এখন টিকা দেওয়া যাবে না। প্রথমে শুনেছিলাম দেওয়াই যাবে না। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আপনার সঙ্গে আমার চুক্তি আছে। এটা দুই দেশের মধ্যে চুক্তি। আইনত এটা মানতে হবে। টিকা যে আসছে, তা এখন পরিষ্কার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুসরণ করেই টিকা বিতরণ করা হবে।

বিজ্ঞাপন

সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি কেনাকাটায় দুর্নীতি ও অনিয়মের ঘটনা বেশি ঘটছে। প্রতিকার কী?

এম এ মান্নান: কারণ, আপনি বাজেটটা দেখুন। এবার আমরা উন্নয়ন বাজেট দিয়েছি ২ লাখ ২ হাজার কোটি টাকার। ১৯৭৩ সালে যেটি ছিল ৫০০ কোটি টাকার। প্রায় ৪৬ গুণ বেড়েছে। তাই চাপ বাড়ছে। এ অনিয়ম নানাভাবে হচ্ছে। এখানে–ওখানে পালিয়ে বেড়াচ্ছে অনেকে। বেগমপাড়ায় চলে যাচ্ছে। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। আমাদের পূর্বপুরুষেরা এত টাকা দেখেনি। আমি মনে করি, আইনের প্রয়োগ আমাদের কম। দুর্নীতির কারণে চীনে গুলি করে মানুষ মেরেছে। চীনের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাকেও গুলি করা হয়। আমরা এ রকম কিছু করতে পারি না। আমরা এক পরিবারের দেশ। সবাই বাঙালি। একই চিন্তার। সে জন্য হয়ে ওঠে না। মানতেই হবে, এখন দুর্নীতির একটা জোয়ার উঠেছে। আমি মনে করি, দুর্নীতি কমাতে বড় বড় দুর্নীতিবাজকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া জরুরি। তাহলে অন্যরা সতর্ক হবে।

২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে আপনি প্রকল্প পরিচালকদের (পিডি) কড়া বার্তা দিয়েছিলেন। তারপরও কেন পিডিদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না?

এম এ মান্নান: পিডিদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। কারণ, তারা আমার অধীনে কাজ করে না। তাদের মন্ত্রী আছে, সচিব আছে। সরকারি চাকুরেরা ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রামের বাইরে যেতে চায় না। ডিসি–এসপিসহ হাতে গোনা কয়েকটি পেশার কর্মকর্তা ছাড়া বাকিদের তো কর্মক্ষেত্রে দেখাই যায় না। তাঁরা কর্মক্ষেত্রে থাকেন না। একজনের পোস্টিং সুনামগঞ্জে, কিন্তু তিনি থাকেন সিলেটে। আবার যাঁর পোস্টিং সিলেটে, তিনি থাকেন ঢাকায়।

সরকারি কেনাকাটায় অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধে উত্তরণের উপায় কী বলে আপনি মনে করেন?

এম এ মান্নান: আমি মনে করি, আইনের যথাযথ প্রয়োগ ঘটাতে হবে। হাজার হাজার আইনের দরকার নেই। আমাদের আইনের সংস্কারের প্রয়োজন। অনেক আইন আছে ব্রিটিশরা করেছে। এগুলো খুঁজেও দেখি না। কাজে লাগে না। চালাক আমলা যদি টের পান, তা কাজে লাগিয়ে তার ফায়দা নেন। এ জন্য এসব কিছু পরিষ্কার করা দরকার।

আপনি কি মনে করেন সম্প্রতি প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের মনমানসিকতা অনেকটা বদলে গেছে? রাজনীতিতে আসার আগে আপনিও প্রশাসনে ছিলেন।

এম এ মান্নান: আমি আগে প্রশাসনে ছিলাম। আমার মনে হয়, নতুন যেসব ছেলেমেয়ে সরকারি চাকরিতে এসেছে, এরা অনেক উজ্জ্বল ও চৌকস। কিন্তু আমি একটা জিনিস লক্ষ করেছি, এদের মধ্যে উচ্চাভিলাষ বেশি; যেটা আমাদের মধ্যে ছিল না। এরা সরকারি চাকরিতে ঢুকেই চিন্তা করে আমেরিকা যাওয়া যাবে কি না। অস্ট্রেলিয়া যাওয়া যাবে কি না। পিএইচডির জন্য। অথবা বিদেশে পোস্টিংয়ের জন্য যাওয়া যাবে কি না। সেখানে সুখে–শান্তিতে পাঁচ–সাত বছর কাটিয়ে আসবে। আমরা যখন চাকরি শুরু করি, তখন আমাদের মধ্যে এত উচ্চাভিলাষ ছিল না। দ্বিতীয়ত, দেশের ভেতরে যে ব্যবস্থাপনা পাচ্ছে, সুন্দর অফিস, সুন্দর বাসা। চলার মতো গাড়ি। আমাদের চাকরির প্রথম দিকে এত সুযোগ-সুবিধা ছিল না। আমরা মেনে নিয়েছি। এখনকার কর্মকর্তারা পরিবারের জন্যও গাড়ি ব্যবহার করে। নিজেরাও ব্যবহার করে। কাজের প্রতি জাপানি, জার্মান ও ইংরেজদের যে একাগ্রতা, তা আমাদের মধ্যে নেই।

বিজ্ঞাপন

সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা দেখতে পান কি না?

এম এ মান্নান: আমাদের প্রজন্মের মধ্যে প্রচণ্ড জাতীয়তাবোধ ছিল, যারা ষাট ও সত্তরের দশকে স্কুল–কলেজ পাস করে এসেছে। এটা এখনকার কর্মকর্তাদের মধ্যে নেই। এর কারণ, আপনারা সাংবাদিকেরা খুঁজে বের করতে পারেন। এরা তো বাংলাদেশের সেই সময়টা দেখেনি, যখন আমরা অবজ্ঞার শিকার হয়েছি। তারা মনে করে বাংলাদেশ একটা চমৎকার দেশ। একসময় বাংলাদেশের ছোট উড়োজাহাজও ছিল না। এখন ছয়–ছয়টা উড়োজাহাজ বিমানবন্দরে রেখে দিয়েছি।

সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ঢাকাকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনাই অগ্রাধিকার পাচ্ছে। সব উন্নয়ন দেখা যাচ্ছে ঢাকামুখী। এখান থেকে বেরিয়ে আসার কোনো পরিকল্পনা আছে কি না।

এম এ মান্নান: আমরা তো স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করছি। সংবিধানেও তা বলা আছে। গ্রামে–গঞ্জে উন্নয়ন যাচ্ছে। বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে। সড়ক হয়ে গেছে। স্কুল হচ্ছে। সেতু হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছি। এখন দরকার কাজের সুযোগ। কৃষি থেকে যারা বেরিয়ে আসছে, তারা শহরে চলে আসছে অথবা বিদেশে যাচ্ছে। আমার মনে হয় না ঢাকার দিকে এখন সেভাবে মানুষ আসছে, যা আগে আসত। ইদানীং ঢাকায় আসার প্রবণতা কমে আসছে।

আপনাদের আমলে অনেকগুলো বার্ষিক ও একাধিক পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা হয়েছে। বাস্তবায়নের গতি মন্থর কেন?

এম এ মান্নান: এরই মধ্যে আমরা অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুমোদন দিয়েছি। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় কোভিডের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছি। প্রথমত, আমরা স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়াব। আমরা গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বাড়াব। কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণ করব। বেশি বিনিয়োগ করব। বেশি ভর্তুকি দেব। এখানে বড় ধরনের অগ্রগতি হবে।

দেশে এখন চাল আমদানি করতে হলো। এর কারণ কি ঘাটতি? কিছুদিন আগে কৃষিমন্ত্রী চাল রপ্তানির কথা বলেছিলেন।

এম এ মান্নান: এটা আমাদের বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। মাঝেমধ্যে এ ঘটনা ঘটে। এই ধরুন, পেঁয়াজ, আলু একেকটা সময়ে সমস্যা দেখা দেয়। সংগ্রহ ও বিতরণে এক অদৃশ্য শক্তি আছে। বাজার ব্যবস্থাপনা আরও সুসংহত করতে হবে।

নদীকে অবৈধ দখল–দূষণ থেকে বাঁচাতে নদী কমিশন গঠন করা হয়েছিল। সেই নদী কমিশনের সুপারিশ সরকার বাস্তবায়ন করবে কি না।

এম এ মান্নান: আমি মনে করি, নদী কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা উচিত। সরকারের মৌলিক দায়িত্ব হলো সুপারিশগুলো আরও পরীক্ষা–নিরীক্ষা করা। বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া। যখন নিশ্চিত হওয়া যাবে যে সুপারিশগুলো দেশের জন্য মঙ্গলজনক, তখন অবশ্যই বাস্তবায়ন করা উচিত।

সরকারের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে যে ফারাক আছে, তা কীভাবে কাটিয়ে উঠবেন?

এম এ মান্নান: এর কয়েকটি কারণ আছে। প্রথমত, আমাদের সম্পদের অপ্রতুলতা। বাংলাদেশ একটি স্বল্পোন্নত দেশ। দ্বিতীয়ত, আমাদের ব্যবস্থাপনা দুর্বলতাকে অস্বীকার করব না। ‍দীর্ঘদিন এখানে ঔপনিবেশিক শাসন ছিল। ফলে আমাদের চরিত্রে, মননে যে নেতিবাচক প্রভাব আগে ছিল, তা এখনো আছে। সে কারণে ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারি না। তৃতীয়ত, আমরা এক বুভুক্ষু দরিদ্র জাতি ছিলাম। এখন একটু আয়–উন্নতি হয়েছে। টাকার প্রবাহ বেড়েছে। লোভ–লালসা বেড়েছে। এ ছাড়া আমাদের আবহাওয়া ও সংস্কৃতিও উন্নয়নের সঙ্গে খাপ খায় না। শুনেছি, জাপানিরা টেবিলে কাজ করতে করতে মারা যায়। তারা কাজের প্রতি এতটা দায়িত্বশীল। আমাদের সংস্কৃতিতে কাজের প্রতি ততটা দায়িত্বশীলতা দেখা যায় না। বারো মাসে তেরো পার্বণ আর কোনো দেশে আছে কি না, জানা নেই। আমি সরকারি চাকরিতে ছিলাম। দেখেছি, কেউ এক দিনের ছুটি নিয়ে বাড়ি গিয়ে তিন দিনেও আসেন না। কোনো উৎসবে সরকার তিন–চার দিন ছুটি দিল। সেটিকে গড়িয়ে সপ্তাহে নিয়ে যায়। এটা উন্নয়নের সঙ্গে যায় না। কাজের মধ্যে ঢিলেঢালা ভাব দেখা যায়। আমি মনে করি, আমাদের এখানে কাজের গতি আর প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো জরুরি।

সরকারি খাতের শিল্পকারখানা ক্রমাগত লোকসান গুনছে। কিন্তু বেসরকারি খাত লাভ করছে। কীভাবে পারছে?

এম এ মান্নান: আমি বলব এটা বাংলাদেশের আরেক চমক। স্বাধীনতার পর অনেক সম্পদ আমাদের হাতে চলে এসেছে। সেটা আমাদের বেশ কাজে দিয়েছে। আমাদের পোশাক খাতে বড় অগ্রগতি এল ছিয়াত্তর–সাতাত্তর সালে। নুরুল কাদের খানের দেশ গার্মেন্টস দিয়ে এটা শুরু হয়েছিল। এই খাত যে এত তাড়াতাড়ি বিকাশ ঘটবে, তা অনেকের চিন্তায়ই ছিল না।

পরিকল্পনামন্ত্রী হিসেবে আপনার কাছে জানতে চাইছি কবে নাগাদ পদ্মা সেতু চালু করা সম্ভব হবে?

এম এ মান্নান: আমি আশা করছিলাম এই বছরেই। এই বিজয় দিবসে। কিন্তু আমাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী বলেছেন, আগামী বছরের জুনে চালু হবে। এত দিন যেহেতু অপেক্ষা করেছি, আরেকটু না হয় করলাম। এটা তো আমাদের মুঠোর মধ্যে।

বিজ্ঞাপন

আপনি এর আগে একই সঙ্গে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। দুটি মন্ত্রণালয়ের কাজের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক আছে। এখন কি দূরত্ব তৈরি হয়েছে?

এম এ মান্নান: আমরা পরিকল্পনা করি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আলোকে। সেখানে ঠিক করা হয় কোন খাতে কত টাকা খরচ করব। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করেই এটি ঠিক করা হয়। আমাদের মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো বা এমটিবিএফ আছে। কোন মন্ত্রণালয়ের জন্য কত টাকা বরাদ্দ, সেটা সবাই জানে। তবে মাঝেমধ্যে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আছে। চিঠি যায় না। এটা বাংলাদেশে চিরায়ত।

প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।

আবদুল মান্নান: প্রথম আলোকেও ধন্যবাদ।

সাক্ষাৎকার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন