বিজ্ঞাপন
  • দরিদ্র মানুষের মধ্যে এবং বস্তি এলাকায় সংক্রমণ ও মৃত্যু কম, এমন ধারণা নিয়ে থাকা ঠিক হবে না।

  • লকডাউনে ক্ষতির তুলনায় মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করতে ব্যয় হয় ১৮ ভাগের ১ ভাগ।

  • সার্জিক্যাল মাস্কের কার্যকারিতা ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত।

  • টিকা সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। কিন্তু সবাইকে টিকার আওতায় আনা সময়সাপেক্ষ বিষয়।

বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে নানা অস্পষ্টতা রয়েছে। অনেকের ধারণা, দরিদ্র মানুষের মধ্যে এবং বস্তি এলাকায় করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার কম।

মুশফিক মোবারক: বিষয়টি আসলেই অস্পষ্ট। অনেক দিন ধরে ভারতেও এই অস্পষ্টতা ছিল। দেশটিতে সরকারের পরিসংখ্যানের বাইরেও কিছু তথ্য-উপাত্ত রয়েছে, যা দিয়ে পরিস্থিতি আঁচ করা যায়। যেমন ভারতে স্বাভাবিক সময়ে দিনে প্রায় ২৭ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। এর সঙ্গে করোনায় আক্রান্ত হয়ে সরকারি হিসাবে দিনে চার হাজারের মতো মানুষের মৃত্যু যোগ হবে। কিন্তু একটি দিক লক্ষণীয়, সেটি হলো ভারতে এখন শ্মশান বা সৎকারের সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যবসা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় চার গুণ বেড়েছে। করোনায় মৃত্যু যদি চার হাজারের মতো হয় তাহলে ব্যবসা তো এতটা বাড়ার কারণ নেই। তাই কম সংক্রমণ ও মৃত্যুহারের সরকারি তথ্যই সব নয়। তিন মাস আগেও ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল, করোনা নিয়ন্ত্রণে এসে গেছে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে বিষয়টি তেমন নয়। তাই দরিদ্র মানুষের মধ্যে এবং বস্তি এলাকায় সংক্রমণ ও মৃত্যু কম, এমন ধারণা নিয়ে থাকা ঠিক হবে না। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা দেওয়াটাও একধরনের অপরিক্বতা। আসলে আমরা এখনো কেউই জানি না বিষয়টি কতটা জটিল। এ পরিস্থিতিতে সর্বজনীন মাস্ক ব্যবহারের বিষয়টি এসেছে। এখানে শুধু বললেই হবে না যে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। মাস্ক নিয়ে প্রত্যেকের দরজায় দরজায় যেতে হবে। এ জন্য দরকার সমন্বিত পদক্ষেপ।

সংক্রমণ ও মৃত্যু নিয়ে বাংলাদেশের সরকারি তথ্যের বিষয়ে কী বলবেন?

মুশফিক মোবারক: সরকারি তথ্য-উপাত্তের বাইরে মৃত্যু আছে কি নেই, তা আমার পক্ষে জানা সম্ভব নয়। তবে এটা বলতে পারি, আমরা করোনা জয় করে ফেলেছি, এভাবে আগাম বলা ভুল হবে। কোনোভাবেই পরিস্থিতিকে খাটো করে দেখা ঠিক হবে না। তাই আমি মাস্ক পরা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিতে চাই। এতে কম খরচে বহু জীবন বাঁচানো সম্ভব।

আপনার গবেষণার পদ্ধতি ও ফলাফল নিয়ে বলুন।

মুশফিক মোবারক: ২০২০ সালের মার্চ থেকে আমরা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে শুরু করি। ফোনে জরিপ করে ওই বছর এপ্রিলে জানতে
পারি, ৯৫ শতাংশ মানুষ বলছে যে তারা মাস্ক ব্যবহার করছে। এই তথ্য যাচাই করতে আমরা জানতে চেষ্টা করলাম, তাঁদের আশপাশের মানুষ মাস্ক পরছে কি না। এই যাচাইয়ের ফলে আমাদের হিসাবে মাস্ক ব্যবহারের হার নেমে এল ৮০ শতাংশে। এরপর আমরা দেশের গ্রাম, বাজার ও রাস্তার ১ হাজার ৮০০ স্থানে একসঙ্গে এক ঘণ্টার জন্য কর্মীদের নামাই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য। দেখা গেল, ৩০ শতাংশের মতো মানুষ মাস্ক ব্যবহার করে। এরপর নিবিড় পর্যবেক্ষণ কৌশল ব্যবহার করে নিশ্চিত হলাম, আসলে সঠিকভাবে মাস্ক ব্যবহারের হার মাত্র ১২ থেকে ১৩ শতাংশের মতো। তখন আমরা আমাদের গবেষণার পদ্ধতি ঠিক করি। দেশের ৬০০টি গ্রামে সাড়ে ৩ লাখ মানুষের ওপর ১০ সপ্তাহ ধরে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। এই গবেষণা করতে আমরা উচ্চ মানের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি (নিয়ন্ত্রিত মহড়া) ব্যবহার করি, অনেকটা টিকা পরীক্ষার মতো। নিয়মিত মাস্ক পরার অভ্যাস গড়ে তুলতে আমাদের গবেষণায় ২০ ধরনের কৌশল ব্যবহারের চেষ্টা করি। এর মধ্যে চারটি কৌশল বেশি কার্যকর
ছিল, যা সমন্বিতভাবে প্রয়োগ করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।

চারটি কৌশল কী ছিল?

মুশফিক মোবারক: চারটি কৌশলের সমন্বিত প্রয়োগকে আমরা নর্ম (এনওআরএম) বলছি। এর মধ্যে রয়েছে প্রত্যেকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিনা মূল্যে মাস্ক বিতরণ; মাস্ক ব্যবহারের গুরুত্ব বোঝাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান ও জাতীয় ইমাম একাডেমির পরিচালকের ভিডিও বার্তা প্রচার ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শগুলোর তুলে ধরা; শুক্রবার পবিত্র জুমার দিন মসজিদে মুসল্লিদের মধ্যে মাস্ক পরার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা। এসব কৌশল একসঙ্গে প্রয়োগ করে দেখা গেল মাস্ক পরার হার ১০ থেকে ১২ শতাংশ বেড়ে গেছে। এরপর আমরা আরেকটি কৌশল যোগ করি। রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আমাদের কর্মীরা লোকজনকে মাস্ক পরার বিষয়টি মনে করিয়ে দিতে শুরু করলেন। কেউ মাস্ক না পরলে তাকে আন্তরিকতার সঙ্গে বলা হলো, ‘গ্রামে তো সবাইকে মাস্ক দেওয়া হয়েছে, আপনি পরেননি কেন?’ একই সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকির কথাও জানানো হয়। মাস্ক না থাকলে বাড়ি থেকে তা আনা, বাড়ি বেশি দূরে হলে তাঁকে আরেকটি মাস্ক দেওয়া—এভাবে অভ্যাস গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। এতে দেখা গেল মাস্ক পরার হার ৪৫ শতাংশের মতো বেড়ে গেছে। মোট ১০ সপ্তাহের গবেষণার শেষ তিন সপ্তাহ আমরা কোনো হস্তক্ষেপ করিনি। তখনো দেখেছি মাস্ক পরার হার বেড়ে ৪৫ শতাংশের মতো দাঁড়িয়েছে।

আপনারা গবেষণায় বলছেন, মাস্ক পরলে মানুষের জীবন বাঁচে। এর একটি অর্থনৈতিক মূল্যও বের করেছেন।

মুশফিক মোবারক: যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সামষ্টিক অর্থনীতিবিদদের গবেষণায় দেখা গেছে, লকডাউন চলাকালে যে পরিমাণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে যায়, তা জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) ১০ শতাংশের সমান। অন্যদিকে লকডাউনে সেই ক্ষতির তুলনায় মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করতে ব্যয় হয় ১৮ ভাগের ১ ভাগ। মাস্ক ব্যবহারের এই মডেল এখন ভারতের গুজরাটে ব্যবহৃত হচ্ছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকা, পাকিস্তানের লাহোর ও উরুগুয়ের মন্টেভিডিও শহরেও একই প্রকল্প চালু হয়েছে। ব্র্যাক ও সিএসও অ্যালায়েন্স দেশের ৩৮টি জেলায় এই কাজ শুরু করেছে।

আপনার গবেষণায় আসা মানুষেরা যেসব মাস্ক ব্যবহার করেছেন তার কি কোনো বিশেষত্ব ছিল?

মুশফিক মোবারক: আমরা প্রথমে বাংলাদেশের পোশাক কারখানায় কী ধরনের উপকরণ ব্যবহার করে মাস্ক তৈরি হয়, তা জানার চেষ্টা করি। এরপর তাদের কাছ থেকে নমুনা নিয়ে বিশেষ নকশায় মাস্ক তৈরি করা হয়। এসব মাস্ক নিয়ন্ত্রিত উপায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও মুম্বাইয়ে টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চে। এতে দেখা যায়, সার্জিক্যাল মাস্কের কার্যকারিতা ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত। আর ২০ বার ধোয়ার পরও এর কার্যকারিতা ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত থাকে। অন্যদিকে কাপড়ের মাস্কের কার্যকারিতা প্রায় ৪০ শতাংশ।

আপনাদের গবেষণায় উঠে এসেছে, মাস্ক ব্যবহারের ফলে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার অভ্যাস তৈরি হয়। এ ক্ষেত্রে আসলে সম্পর্ক কী ও কতটা?

মুশফিক মোবারক: গবেষণায় দেখা গেছে, সমন্বিত উপায়ে মাস্ক ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার হার ২৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে। এটা অন্যান্য এলাকার তুলনায় ৬ শতাংশ বেশি। মূলত নিয়মিত নজরদারি ও পর্যবেক্ষণের কারণে মানুষের মধ্যে যে সচেতনতা তৈরি হয়, তা থেকেই সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার অভ্যাস গড়ে ওঠে।

জীবন ও জীবিকার প্রশ্নে আপনার গবেষণার মূল বার্তা কী?

মুশফিক মোবারক: আমরা জীবন বাঁচাব না, জীবিকা বাঁচাব—এই বিতর্ক অনেক দিন ধরেই চলছিল। এখন দেখা যাচ্ছে, আসলে এই বিতর্কের মধ্যে একটা ভ্রান্ত বৈপরীত্য আছে। দেখুন, মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে পারলে লকডাউন প্রয়োজন হয় না। তাতে জীবিকাও বাঁচে।

আপনাদের গবেষণার ফলাফলকে মানুষ কেন কাজে লাগাবে বলে মনে করেন?

মুশফিক মোবারক: গবেষণাটি বাংলাদেশেরই নিজস্ব উদ্ভাবন। বিভিন্ন দেশে প্রয়োগে ভালো ফল পাওয়া যাচ্ছে। দেশে দেশে সংক্রমণ কমাতে নানা রকম বার্তা দেওয়া হয়, উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু নির্ভর করতে হবে বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্তের ওপর। তাই আমাদের আশা, বাংলাদেশেও এই মডেল কাজে লাগানো হবে।

করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এখন পর্যন্ত ভিয়েতনামের সাফল্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বাংলাদেশ ভিয়েতনামের কাছাকাছি। কিন্তু দুই দেশের মধ্যে করোনা ব্যবস্থাপনার সাফল্যে পার্থক্য এত বেশি কেন?

মুশফিক মোবারক: আসলে করোনা নিয়ন্ত্রণে ভিয়েতনাম ও তাইওয়ানের কাজ বেশ দৃষ্টি কেড়েছে। আবার ইবোলা মহামারির অভিজ্ঞতার কারণে আফ্রিকার কিছু দেশও ভালো করেছে। বাংলাদেশে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আগের তুলনায় প্রযুক্তির ব্যবহার ও উদ্ভাবন বেড়েছে। কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম ও তাইওয়ানের দিকে তাকালে বোঝা যায়, আমরা প্রযুক্তিগত দিক থেকে পিছিয়ে আছি।

করোনার বর্তমান পরিস্থিতে দেশে কোন কোন ক্ষেত্রে মনোযোগ বাড়ানো জরুরি?

মুশফিক মোবারক: তিনটি ক্ষেত্রে মনোযোগ দেওয়া জরুরি। ওষুধবহির্ভূত উদ্যোগ—যার মধ্যে মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে সমন্বিত উদ্যোগে জোর দেওয়ার বিষয়টি থাকবে। বাকি দুটি বিষয় হলো স্বাস্থ্য খাতে নজরদারি বাড়ানো ও গণটিকাদান। টিকা সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। কিন্তু সবাইকে টিকার আওতায় আনা সময়সাপেক্ষ বিষয়। তাই এই সময় মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে জোর দেওয়া দরকার।

সাক্ষাৎকার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন