বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো: দেশের স্বাস্থ্য খাত দেশের দুর্নীতিগ্রস্ত খাতগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত। করোনা পরিস্থিতিতেও স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির যে চিত্র শুধু গণমাধ্যমে এসেছে, তা অনেককে বিস্মিত করেছে। চিকিৎসকদের সুরক্ষাসামগ্রী কেনায় দুর্নীতি থেকে শুরু করে করোনা পরীক্ষার ক্ষেত্রেও জালিয়াতি হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাড়িচালকের অঢেল সম্পদ থাকারও খবর এসেছে। স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?

সৈয়দ আব্দুল হামিদ: অন্যান্য খাতের মতো স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি ও দুর্নীতির ধরন দুটোই পুরোনো। এর মধ্যে আছে নিয়োগ, বদলি ও প্রমোশনসংক্রান্ত দুর্নীতি, অন্যটি হলো কেনাকাটা বা টেন্ডারসংক্রান্ত দুর্নীতি। কোভিডকালে এ দুই ধরনের দুর্নীতিই আমরা দেখতে পেয়েছি। দুই ক্ষেত্রেই বাইরের ও ভেতরের দুর্নীতিবাজ চক্রের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। প্রথমটির ক্ষেত্রে মূলত রিজেন্টের সাহেদ বা জেকেজির সাবরিনার মতো স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিরা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের অসত্য বা অসম্পূর্ণ রেফারেন্স ব্যবহার করে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ওএসডি বা অন্যত্র পোস্টিংয়ের ভয়ে অনেক সময় ইচ্ছার বিরুদ্ধে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে। আর কিছু দুর্নীতি আছে যা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্বপ্রণোদিত হয়ে করে থাকে। আবার কিছু দুর্নীতি আছে যেটা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ম্যানেজারিয়াল দক্ষতা না থাকার কারণে ঘটে। এ ক্ষেত্রে সাধারণত অধস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারী যাঁরা দীর্ঘকাল একই বিভাগে কর্মরত আছেন, তঁাদের মাধ্যমে সংঘটিত হয়। সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের মাধ্যমে সব ধরনের দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব। বাইরে থেকে যে দুর্নীতি হয়, তা বন্ধে সরকারঘোষিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির সফল বাস্তবায়ন করা দরকার। দ্বিতীয়টির জন্য প্রত্যেক কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ও পরিবারের সদস্য এবং নিকটাত্মীয়দের বার্ষিক সম্পদ বিবরণী প্রকাশের কার্যকরী ব্যবস্থা থাকা দরকার। আর তৃতীয় ধরনের জন্য স্বাস্থ্য খাতের দক্ষ ব্যবস্থাপক তৈরির নতুন ধারা তৈরি করাসহ ছোট-বড় সব পদ নিয়মিত বদলির আওতায় আনা প্রয়োজন। আর দুর্নীতিবাজদের সামাজিকভাবে বর্জনের তো কোনো বিকল্প নেই।

প্রথম আলো: একদিকে দুর্নীতি চলছে, অন্যদিকে করোনা চিকিৎসার সম্মুখসারির সৈনিক চিকিৎসকেরা যখন তাঁদের নিম্নমানের মাস্ক বা সুরক্ষাসামগ্রী নিয়ে অভিযোগ করেছেন, তখন তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এটা কেমন স্বাস্থ্য প্রশাসন?

সৈয়দ আব্দুল হামিদ: আমাদের প্রশাসনযন্ত্রকে আরও উদার হতে হবে। সত্য প্রকাশ ও ভালো কাজকে উৎসাহিত করতে হবে। শাক দিয়ে মাছ ঢাকার পুরোনো কৌশল সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে আর কাজ করে না। এ খাতের ওপরের সারির ব্যবস্থাপকদের অনেকেরই স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় মাঠ প্রশাসনের অভিজ্ঞতা নেই। তাই বাস্তবতা বোঝার ক্ষেত্রে যথেষ্ট ঘাটতি আছে। তারা সঠিক তথ্য প্রদানের মাধ্যমে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের বিরাগভাজন হতে চায় না। তাই মাঠপর্যায়ের কেউ মুখ ফসকে সত্য কথা বলে ফেললে নিজেদের পিঠ বাঁচানোর জন্য উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে চেষ্টা করে। আর ফলাফল হলো সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে বদলি বা ওএসডি।

প্রথম আলো: গত বছরের শুরুতে স্বাস্থ্য খাতে কেনাকাটা ও নিয়োগ থেকে শুরু করে দুর্নীতির ১১টি খাত চিহ্নিত করে দুদক ২৫ দফার একটি সুপারিশ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর হাতে তুলে দিয়েছিল। এর কোনো ফলাফল স্বাস্থ্য খাতের কাজে প্রতিফলিত হয়েছে কি?

সৈয়দ আব্দুল হামিদ: দুর্নীতির ক্ষেত্র চিহ্নিত করা এবং তা নিরসনের সুপারিশ প্রণয়ন করা একটা বড় বিষয়। আর দুদককে সে জন্য ধন্যবাদ জানাই। এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য যে কাঠামোগত সক্ষমতা থাকা দরকার, তা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নেই। আর শর্ষের মধ্যে ভূত তো আছেই। সাধারণ পানি পড়া বা ঝাড়ফুঁক দিয়ে তা সারানো সম্ভব নয়। দরকার দক্ষ এবং অভিজ্ঞ ওঝা। তবে একটি কথা তো সত্য। গণমাধ্যমের কল্যাণে হোক আর সরকারের উদার নীতির কারণেই হোক, এসব দুর্নীতির প্রকৃত চিত্র তো কিছুটা বেরিয়ে আসছে।

প্রথম আলো: স্বাস্থ্য খাতের যে প্রশাসনিক কাঠামো, তাকে দুর্নীতি সহায়ক বলে মনে করেন কি? এখানে কোনো কাঠামোগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন কি?

সৈয়দ আব্দুল হামিদ: খুব ভালো প্রশ্ন। দেখুন, আমি আগেও বলে এসেছি স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির একটা বড় মাধ্যম হচ্ছে অধস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারী। প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সক্ষম করে তুলতে পারলে এ ধরনের দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব। তা ছাড়া সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ম্যানেজারিয়াল দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নির্ভয়ে কাজ করার সুযোগ দিলে বহিঃউৎসের রেফারেন্স দিয়ে দুর্নীতির ধারাও বন্ধ করা সম্ভব। আসলে স্বাস্থ্য খাতের প্রশাসনিক কাঠামো পুরোপুরি ঢেলে সাজাতে হবে। আর এ জন্য প্রথম দিকে মাঠ প্রশাসনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তাকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সব ঊর্ধ্বতন পদে পর্যায়ক্রমে পদায়ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে তাদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য প্রশাসন ক্যাডারের মতো শক্তিশালী ব্যবস্থা থাকতে হবে। মেডিকেল কলেজের অধ্যাপকদের অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয়ের কোনো প্রশাসনিক পদে সরাসরি অধিষ্ঠিত করা থেকে বিরত থাকা দরকার। তবে তাদের সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে উপদেষ্টা বা পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে।

প্রথম আলো: সচিবালয়ভিত্তিক প্রশাসনকে দক্ষ, সক্ষম ও সেখানকার দুর্নীতি দূর কমানোর পথ কী?

সৈয়দ আব্দুল হামিদ: এ জন্য তাদের জ্যেষ্ঠতা অনুযায়ী দাপ্তরিক কাজে ক্ষমতার ডেলিগেশন দরকার। অন্যদিকে তাদের পোস্টিং ও ট্রান্সফার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুটো বিভাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যেতে পারে। আর তাহলে তারা স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিন কাজ করার সুযোগ পাবে এবং অর্জিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ পাবে। আর এভাবে তাদের সক্ষম করতে পারলে রেফারেন্সভিত্তিক দুর্নীতিও বন্ধ করা সম্ভব। তবে কোনো বড় প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হলে প্রতিবছর তার ব্যক্তিগত ও পরিবারের সদস্য এবং নিকটাত্মীয়দের বার্ষিক সম্পদ বিবরণী প্রকাশ বাধ্যতামূলক করতে হবে। এ ছাড়া স্বাস্থ্য খাতের মাঠপর্যায় থেকে সচিবালয় পর্যন্ত সব প্রশাসনিক পদের জন্য একটি নতুন ক্যাডার তৈরি করা দরকার। তারা ক্যারিয়ারের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শুধু স্বাস্থ্য খাতের প্রশাসনিক কাজে নিয়োজিত থাকবে। এ ক্ষেত্রে এমবিবিএস ডাক্তারদের পাশাপাশি স্বাস্থ্য অর্থনীতি, অর্থনীতি, ম্যানেজমেন্ট ও হিসাবরক্ষণের স্নাতকদের আবেদন করার সুযোগ থাকতে পারে।

প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।

সৈয়দ আব্দুল হামিদ: আপনাকেও ধন্যবাদ।

সাক্ষাৎকার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন