বিশেষ সাক্ষাৎকার : আলী রীয়াজ

গণভোটে সরকার পক্ষ নিতে পারে, আইনি বাধা নেই

আলী রীয়াজ প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদমর্যাদা)। যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিস্টিংগুইশড অধ্যাপক। এর আগে দায়িত্ব পালন করেছেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি এবং সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে। প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন, গণভোট নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান, জুলাই সনদ ও সংস্কার বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার এবং আগামী নির্বাচনসহ কিছু বিষয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: মনজুরুল ইসলাম

প্রথম আলো:

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি  গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। এই গণভোটে সরকার একটি পক্ষ নিয়েছে বলে অনেকে অভিযোগ করছেন। সরকারের এ অবস্থানকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

আলী রীয়াজ: সরকারের অবস্থানটা খুব সুস্পষ্ট। প্রথমত, গণভোটে পক্ষ নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের আইনিভাবে কোনো বাধা নেই। এমনকি যাঁরা এ নিয়ে প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করছেন, তাঁরাও কিন্তু এটা স্বীকার করে নিচ্ছেন যে আইনি কোনো বাধা নেই। সংবিধান দেখুন, আরপিও দেখুন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন–সংক্রান্ত আদেশ দেখুন, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা ভূমিকা নিতে পারবেন কি না; কিংবা সরকার পক্ষ নিতে পারবে কি না, তা নিয়ে কোথাও আইনিভাবে কোনো বাধা নেই। আন্তর্জাতিকভাবে যদি দেখেন, ব্রেক্সিটের ক্ষেত্রে কী হয়েছে? ডেভিড ক্যামেরন তো প্রত্যক্ষভাবে ইইউতে থাকার পক্ষে ছিল। এ রকম অসংখ্য উদাহরণ দিতে পারব; যখনই কোনো দেশে গণভোট হয়, তখন সরকারের পক্ষ থেকে এভাবে প্রচারণা চালানো হয়।

গণভোটে পক্ষ নেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বিষয়টা নৈতিক। আমি এই নৈতিক ভিত্তিটার ওপরই জোর দিতে চাই। এই সরকার কিসের সরকার? এই সরকার হচ্ছে একটা গণ–অভ্যুত্থানের ফল। সরকার বলেছিল যে সংস্কার করবে, এটাই তো তার ম্যান্ডেট। তো সংস্কার প্রক্রিয়াটা তো শুরু হয়েছে, বিভিন্ন রকম সংস্কার কমিশন তৈরির মধ্য দিয়ে এবং পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনা হয়েছে। কিছু বিষয়ে একমত হওয়া গেছে, কিছু বিষয়ে ভিন্নমত সত্ত্বেও জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি হয়েছে। তাহলে এটার ওনারশিপটা কার? এই ওনারশিপটা হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোর এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মাধ্যমে যাঁরা যুক্ত হয়েছেন, তাঁদের।

শুধু তা–ই নয়, সংবিধান সংস্কার কমিশন বলুন, নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন বলুন, প্রতিটা কমিশন স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে কথা বলেছে। আমি সংবিধান সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে বলতে পারি যে আমরা এক লাখ মানুষের অপিনিয়ন নিয়েছি। ছেচল্লিশ হাজার হাউসহোল্ড সার্ভে হয়েছিল, ৫০ হাজারের বেশি মানুষ ওয়েবসাইটে তাঁদের মতামত দিয়েছেন। পুরো প্রক্রিয়ায় জনগণ এবং রাজনৈতিক দলগুলো যুক্ত ছিল। এসবের মধ্য দিয়ে তৈরি করা হয়েছে একটা সনদ।

অন্তর্বর্তী সরকার তো এটা বলছে না যে তারা সংস্কারের বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছে। তারা বলছে, ‘আমরা সকলে একমত হয়েছি, এখন জনগণের সম্মতিটা আমরা নিতে চাই।’ সম্মতি নেওয়ার পরে যারা ক্ষমতায় আসবে, এমনকি যারা ক্ষমতায় আসবে না, তাদেরও একটি দায়িত্ব রয়েছে। এটা তো কেবল ক্ষমতাসীনদের এজেন্ডা হতে পারে না। ফলে সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে, যে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ম্যান্ডেট নিয়েছে, সেটি যেন জনগণের সম্মতি লাভ করে, সেটি নিশ্চিত করা; সেটিই সরকার করছে। আমরা একটি এজেন্ডা তৈরি করার চেষ্টা করেছি, ভবিষ্যতে বাংলাদেশে সব রাজনৈতিক দল সেটির প্রতি কমিটেড থেকে সেগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে। আমি তো এর মধ্যে কোনো রকম বিভ্রান্তির সুযোগ দেখি না।

প্রথম আলো:

গণভোটে ভোটাররা ব্যালটে কোনো মার্কার বদলে চারটি প্রশ্নের উত্তর দেবেন। সংবিধান সংস্কারসংক্রান্ত ৪৮টি প্রস্তাবকে ৪টি প্রশ্নের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই চার প্রশ্নের উত্তর হবে আবার একটি, ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’। গণভোটের এই প্রশ্নপদ্ধতি নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন। এই প্রশ্নটা কতটা যৌক্তিক?

আলী রীয়াজ:  প্রশ্ন তোলাটা অযৌক্তিক। গণভোটে চারটি প্রশ্ন করা হয়নি, এতে চারটি বিষয় রয়েছে। সব বিষয়কে সবার সামনে চারটি প্রধান বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রশ্ন একটিই। চারটি বিষয়ে একটি প্রশ্ন—আপনি এগুলোতে একমত হচ্ছেন কি হচ্ছেন না। একটি দেশে যখন নতুন সংবিধান গ্রহণের জন্য গণভোট হয়;  কিংবা বড় ধরনের পরিবর্তন করার প্রয়োজন হয়, সংবিধানের অনেকগুলো অনুচ্ছেদ থেকে, এমনকি ১০০ থেকে ২০০টির বেশি অনুচ্ছেদ থাকে, তাহলে কি ১০০টি আলাদা আলাদা প্রশ্নে গণভোট হবে? না, সেটি হবে না। কেনিয়ার সংবিধান বিষয়ে গণভোট দেখুন, তিউনিসিয়ার গণভোট দেখুন, এমনকি তুরস্কের গণভোট দেখুন। বিষয় অনেকগুলো কিন্তু; গণভোটের প্রশ্ন একটাই।

বাংলাদেশেও একই রকম উদাহরণ রয়েছে। জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং জেনারেল এরশাদের আমলে ১৮ ও ১৯ দফা কর্মসূচি নিয়ে একটি প্রশ্নেই গণভোট হয়েছে। ১৯৯১ সালে আমরা যখন রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় গিয়েছিলাম, তখনো তা–ই হয়েছে। রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় ব্যবস্থা কি এক বাক্যে হয়েছে?  তা হয়নি। অনেকগুলো অনুচ্ছেদ পরিবর্তন করতে হয়েছে, সেটিই স্বাভাবিক। কারণ, সংবিধান একটি কম্পোজিট ডকুমেন্ট।  

মূল বিষয় হচ্ছে, জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের জন্য এই গণভোট হচ্ছে। আমরা কেন গণভোটের কথা বললাম?  প্রতিটি রাজনৈতিক দল ও জোট এ বিষয়ে অভিন্ন মত পোষণ করেছে। কেউ ভিন্নমত দেয়নি, সবাই বলছে গণভোট হবে। তো গণভোট কীভাবে হবে, সেটিই ব্যবস্থা করা হয়েছে। গণভোট মানেই ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’।

আলী রীয়াজ
ছবি: প্রথম আলো
প্রথম আলো:

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে কী হবে আর ‘না’ জয়ী হলে কী হবে?

আলী রীয়াজ: ‘না’ জয়ী হলে কী হবে সেটি আমি কল্পনাও করতে পারি না এবং আমি মনে করি না যে সেটি হবে। আমি তাই প্রথমেই নেতিবাচক অবস্থান নেওয়ার বিরুদ্ধে। গত দেড় বছরের অভিজ্ঞতা হচ্ছে, যারাই ‘না’ বলেছেন, তাঁরা শেষ পর্যন্ত ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছেন। সংবিধান সংস্কার কমিশনের দায়িত্ব যখন নেই, তখন অনেকেই বলেছিলেন যে এই কমিশনের পক্ষে কোনো রকম সুস্পষ্ট সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়াই সম্ভব হবে না। তাঁরা বিভিন্ন রকম যুক্তি দেখিয়েছেন; কিছু কিছু যুক্তি অত্যন্ত দুর্বল ছিল।
যখন আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দলগত ও জোটগতভাবে বসেছি, অনেকেই আমাদের বলেছেন যে দলগুলো কথা শুনবে না, একমত করাতে পারবেন না। কিন্তু আলোচনার মাধ্যমে আমরা অনেক বিষয়ে একমত হয়েছি। তারপর যেগুলোতে ভিন্নমত ছিল, সেগুলো নিয়ে আমরা পাবলিকলি কনভার্সেশনে গেলাম। ফলে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখার কোনো কারণ নেই।

আমি আশাবাদী; আমি আশাবাদী যে জনগণ ‘হ্যাঁ’ বলবে। মানুষের মধ্যে পরিবর্তনের আকাক্ষা আছে। মানুষ দেখতে চান যে অবস্থার পরিবর্তন হোক। তাই ‘না’ জয়ী হলে কী হবে, সেদিকে আমি যেতেই চাই না। আমি মনে করি, জনগণ ইতিবাচকভাবেই ভোট দেবে।

প্রথম আলো:

জুলাই সনদে ১৮০ কার্যদিবস সময় দিয়ে সংসদকে গণভোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংস্কার সম্পন্ন করার যে কথা বলা হয়েছে, সেটি সাংবিধানিক ও আইনিভাবে কতটা যৌক্তিক তা নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁরা বলছেন, এটা সংসদের সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ন করবে। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?

আলী রীয়াজ: প্রথম কথা হচ্ছে যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ আসলে কী? ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদ। তাকে লিমিটেড কনস্টিটিউয়েন্ট পাওয়ার বা সীমিত আকারে গাঠনিক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এটি সবাই মিলে দেওয়া হয়েছে এবং গণভোটের মাধ্যমে জনগণের কাছে সম্মতি চাওয়া হচ্ছে। যদি এটা গণপরিষদ হতো, তাহলে এর আনলিমিটেড কনস্টিটিউয়েন্ট পাওয়ার থাকত; সেটি নতুন সংবিধান দিতে পারত; আবার চাইলে পুরোনো সংবিধান সংস্কার করতে পারত। এ ক্ষেত্রে যেহেতু বিদ্যমান সংবিধানেরই ব্যাপক আকারে সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে, সেহেতু তাকে একটি লিমিটেড কনস্টিটিউয়েন্ট পাওয়ার দেওয়া হয়েছে।

এই লিমিটেড কনস্টিটিউয়েন্ট পাওয়ার দেওয়ার কারণ কি? এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, এখানে কিছু মৌলিক সংস্কার হবে। আপনি যদি দেখেন যে গণভোটে যে বিষয়গুলো গেছে বা জুলাই জাতীয় সনদে যা আছে, সেখানে কিছু মৌলিক সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে। এখন যদি মৌলিক সংস্কারের ক্ষমতাটা সংসদকে না দেন, তাহলে কী দাঁড়াবে? এটা নিয়ে পরে আদালতে প্রশ্ন উঠলে, এটিকে সুরক্ষা দেওয়া যাবে না। এখন যদি কোনো কারণে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে যেটা বলা যাবে, সংসদকে এই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। এই ক্ষমতা কে দিয়েছে? দিয়েছে জনগণ। কারণ, সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে তো বলা হচ্ছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ।’ জনগণের সার্বভৌম আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবেই এই সংবিধান সংস্কার।

১৮০ দিন সময় বেঁধে দেওয়া হচ্ছে কেন? ১৮০ দিন বেঁধে দেওয়া হচ্ছে, যাতে একটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংস্কারটা হয়; আগামী পাঁচ বছর তো এটা অব্যাহত রাখা যাবে না। আমরা বিশ্বাস করি যে ১৮০ দিনের মধ্যে তারা সংস্কার করবে। সাধারণত যেকোনো গণপরিষদের ক্ষেত্রে কী হয়? একটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যদি তারা নতুন সংবিধান তৈরি করতে না পারে, তাহলে সেটি নিজেই ভেঙে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে নেপালে এ রকম হয়েছে। কিন্তু আমরা সেই জায়গায় যেতে চাই না। কারণ, তাতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হবে।

১৮০ দিনের জায়গায় ২৭০ দিন সময় দেওয়া যেত, প্রাথমিকভাবে এ রকম আলোচনাও ছিল; কিন্তু আমাদের মনে হয়েছে যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের মেয়াদ কম থাকা দরকার, যাতে তারা দ্রুততার সঙ্গে সংস্কারের কাজ শেষ করতে পারে। প্রথম দিন থেকেই সংসদ কার্যকর থাকবে, প্রধানমন্ত্রীর নিয়োগ হবে, মন্ত্রিসভা হবে, বাজেট হবে, দেশ পরিচালনা করবে সরকার। এর বাইরে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তারা যেন এই সংস্কারগুলো করতে পারে, সে জন্য ১৮০ দিনের কথা বলা হয়েছে।

আলী রীয়াজ
ছবি: প্রথম আলো
আমাদের সবারই বিবেচনায় রাখতে হবে, জনগণ কী চাইছে। জনগণকে বলতে দিন, তারা কীভাবে সংস্কার বাস্তবায়ন দেখতে চায়; এ বিষয়ে জনগণের কাছে আমরা প্রশ্ন করছি; এ কারণেই গণভোট। গণভোটে যে সিদ্ধান্ত আসবে, সেই অনুযায়ী সংস্কার বাস্তবায়ন করা যেকোনো রাজনৈতিক দলের ওপর একটি নৈতিক দায়িত্ব বলে গণ্য হবে।
প্রথম আলো:

যদি কোনো কারণে ১৮০ দিনের মধ্যে সংস্কার করা না যায়, সে ক্ষেত্রে কী হবে?

আলী রীয়াজ: আমি আশা করি যে সংস্কার হবে। এটা খুব দুরূহ কাজ নয়। সাধারণত কোনো নতুন সংবিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রে কোনো কোনো বিষয়ে ঐকমত্য থাকে না বলে ব্যাপকভাবে আলোচনার প্রয়োজন হয়। এতে শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা সম্পন্ন করা সম্ভব হয় না। এ ক্ষেত্রে নেপাল ও পাকিস্তানের উদাহরণ দেওয়া যায়। সংবিধানের দুটি অংশ থাকে; একটি হচ্ছে আদর্শিক এবং আরেকটি হচ্ছে কাঠামোগত। নেপালে কাঠামোগত প্রশ্নে আটকে গিয়েছিল; পাকিস্তানে কিন্তু ঠিক উল্টোটা হয়েছিল, মৌলিক নীতিগত প্রশ্নে আটকে গিয়েছিল।

আমাদের ক্ষেত্রে একটা সুবিধা রয়েছে। ইতিমধ্যে নয় মাস ধরে আলোচনা হয়েছে এবং একটা দলিল তৈরি হয়েছে। সেই দলিলের অধিকাংশ বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে কীভাবে, কী করা হবে। এর বাইরে সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন আছে, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার দলিল  আছে। পরবর্তী সংসদ চাইলে সেগুলোও ব্যবহার করতে পারবে। ফলে তাদের সংস্কার না করতে পারার কোনো কারণ নেই।

প্রথম আলো:

ধরুন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলো এবং একই সঙ্গে সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হলো। বিএনপির তো অনেক বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট ছিল। এখন বিএনপি যদি সংস্কার করতে চায়, তারা কি নোট অব ডিসেন্টগুলো বাদ দিয়ে সংস্কার করবে, নাকি জুলাই সনদে যা আছে, সেভাবেই তাদের সংস্কার করতে হবে?

আলী রীয়াজ: আমাদের সবারই বিবেচনায় রাখতে হবে, জনগণ কী চাইছে। জনগণকে বলতে দিন, তারা কীভাবে সংস্কার বাস্তবায়ন দেখতে চায়; এ বিষয়ে জনগণের কাছে আমরা প্রশ্ন করছি; এ কারণেই গণভোট। গণভোটে যে সিদ্ধান্ত আসবে, সেই অনুযায়ী সংস্কার বাস্তবায়ন করা যেকোনো রাজনৈতিক দলের ওপর একটি নৈতিক দায়িত্ব বলে গণ্য হবে। একটি রাজনৈতিক দলের ওপর যখন এ রকম নৈতিক দায়িত্ব এসে পড়বে, তখন সে কী করবে, সেই সিদ্ধান্ত তাদের নিতে হবে এবং তারা জনগণের কাছে এই ব্যাপারে একধরনের দায়বদ্ধতার মধ্যে থাকবে।

প্রথম আলো:

আপনি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি হিসেবে কাজ করেছেন। সেই সূত্রে দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংস্কার নিয়ে আলাপ-আলোচনা–বৈঠক করেছেন। সংস্কারের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

আলী রীয়াজ: আমার পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলো সংস্কার করতে চায়। তবে মাত্রাগত ভিন্নতা আছে; কে কতটুকু করতে চায়, কীভাবে করতে চায়, এগুলো নিয়ে কিছু মতপার্থক্য আছে। আবার আলাপ–আলোচনার মধ্য দিয়ে এটা অনেকটা কমেও এসেছে। জুলাই জাতীয় সনদকে কেন্দ্র করে অনেক বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অনেক দল তাদের দলীয় অবস্থান থেকে সরে এসেছে। তারা প্রকাশ্যে এমনটা বলেছে, ‘আমাদের দলীয় অবস্থান ভিন্ন। কিন্তু সবার ঐকমতে৵র বিবেচনায় আমরা এটুকু এলাম।’ ফলে আমার ধারণা, সংস্কার নিয়ে তাদের অঙ্গীকার আছে; তারা পরিবর্তনটা চাচ্ছে।

কোন রাজনৈতিক দলের স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়টি কী? এক অর্থে স্থিতাবস্থা তাদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। কারণ, আমরা যেভাবে কাজ করি, সেভাবেই কাজ করতে অভ্যস্ত হয়ে যাই। কিন্তু ওই জায়গা থেকে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল সরে এসেছে। আমি মনে করি না, কেউই চাইবে ২০০৭–০৮ সালে ফেরত যেতে। আমি মনে করি না, কোনো রাজনৈতিক দলের এ রকম আকাঙ্ক্ষা আছে। একটি বিষয় মনে রাখত হবে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের যে কর্মকাণ্ড ও আচরণ, তা খানিকটা হলেও প্রভাবিত হয়েছে ২০০৭–০৮ সালের অভিজ্ঞতা দিয়ে।

প্রথম আলো:

আপনি বললেন, রাজনৈতিক দলগুলো সংস্কার করতে চায় এবং তাদের একধরনের কমিটমেন্ট আছে। তারা জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরও করেছে। জুলাই সনদে বলা হয়েছে, সনদ স্বাক্ষরের পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে প্রতিটি রাজনৈতিক দল বিদ্যমান ৩০০ সংসদীয় আসনের জন্য প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেবে; কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, ৩০টির বেশি রাজনৈতিক দল একটি আসনেও নারী প্রার্থী দেয়নি। তারা কি সংস্কারের উল্টো পথে যাচ্ছে না?

আলী রীয়াজ: ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়টি একটি জেন্টলম্যানস অ্যাগ্রিমেন্ট ছিল। কিছু দল বলেছিল, আপনারা দেন অথবা না দেন, আমরা  ন্যূনতম ৫ শতাংশ আসনে নারীদের মনোনয়ন দেব। আবার কিছু রাজনৈতিক দল বলেছে, তারা ইমিডিয়েটলি এটা পারবে না; অতএব এটা চাপিয়ে দিয়েন না। ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় আমি একাধিক দিন বলেছি, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন কিছুই চাপিয়ে দেবে না।

যে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরাই এই জেন্টলম্যানস অ্যাগ্রিমেন্টের কথা বলেছিল, একমত হয়েছিল, তাদের মনোনয়নের ক্ষেত্রেও এই ব্যত্যয় থেকে গেল—এতে আমি অত্যন্ত মর্মাহত। গণ–অভ্যুত্থানে নারী জনগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় । পরবর্তী সময়ে তাদের প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কোনো কোনো রাজনৈতিক দল যে ধরনের ভূমিকা নিল, সেটি আসলে গণ–অভ্যুত্থানে নারীদের অংশগ্রহণের স্বীকৃতিকে উপেক্ষা করার শামিল। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য খুব ইতিবাচক কিছু নয়।পাশাপাশি এটিও অনেক গুরুত্বপূর্ণ, ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার সময় নারী আন্দোলনের কর্মীরা, নারী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর চাপ দিতে সফল হননি। তাঁরা সফল হলে এখন পরিস্থিতি হয়তো ভিন্ন হতো।

আলী রীয়াজ
ছবি: প্রথম আলো
প্রথম আলো:

জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় গণভোটে ভোট প্রদানের হার যদি তুলনামূলকভাবে কম হয়, তাহলে কি গণভোটের নৈতিক যে বাধ্যবাধকতা, সেটি নিয়ে কোনো প্রশ্ন তৈরি হবে?

আলী রীয়াজ: বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ গণভোটে ৩৫ শতাংশের কিছু বেশি ভোট পড়েছিল। এতে কি প্রশ্ন উঠেছিল? আপনি কি তাহলে বলবেন, যেহেতু দ্বাদশ সংশোধনী–সংক্রান্ত গণভোটে এক– তৃতীয়াংশের সামান্য বেশি মানুষ ভোট দিয়েছে, তাই আমাদের সংসদীয় ব্যবস্থায় যাওয়াটা নৈতিকভাবে ঠিক ছিল না?

গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের হার তুলনামূলকভাবে কমবেশি হতে পারে। এটা ভোটারদের পছন্দের প্রশ্ন। সংসদ নির্বাচন হচ্ছে ব্যক্তি ও মার্কা পছন্দ করার বিষয়। অন্যদিকে গণভোট হচ্ছে একটি নীতিগত বিষয়। ব্যক্তিকে পছন্দ করা খুব সহজ। কিন্তু নীতিগত বিষয়ে মতামত দেওয়াটা এত সহজ নয়। তাই গণভোটে ভোট প্রদানের হার সংসদ নির্বাচনের চেয়ে কম হতে পারে, তাতে গণভোট নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সুযোগ নেই।

প্রথম আলো:

জুলাই সনদ, গণভোট এগুলো তো মূলত আইনি ও সাংবিধানিক পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িত। শুধু আইনি ও সাংবিধানিক সংস্কার দিয়ে কি স্বৈরাচারী বা ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠার পথ বন্ধ করা যাবে, নাকি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও পরিবর্তন দরকার?

আলী রীয়াজ: এ দুটি পরস্পর–সংশ্লিষ্ট বিষয়। আমি প্রতিষ্ঠানের ওপর জোর দিই, এ কারণে যে প্রতিষ্ঠান যদি দাঁড়িয়ে যায়, তাহলে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়; কিন্তু প্রতিষ্ঠান নিজেই সবকিছু করে দিতে পারবে তা নয়। আবার প্রতিষ্ঠান দুর্বল থাকবে, প্রতিষ্ঠান থাকবে না; কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তিত হয়ে যাবে, সেটিও হবে না। এগুলো আসলে পরস্পর সম্পর্কিত। আমি মনে করি যে সূচনাটা প্রতিষ্ঠাননির্ভর হওয়া উচিত। কারণ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তিত হয় চর্চার মধ্য দিয়ে, এটা হুট করে হবে না।

অনেকে আমাদের বলেছেন, দলের ভেতরে গণতন্ত্র নিয়ে তো আপনারা কিছুই করলেন না। এটা আসলে বাইরে থেকে করা যাবে না। এই চেষ্টাটা ২০০৭-০৮ করা হয়েছিল, বাইরের থেকে চাপিয়ে দেওয়ার ফলে সেটি গণতন্ত্রের ভয়াবহ ক্ষতি করেছে। সে জন্য নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন- এ রকম  প্রতিষ্ঠানগুলো দাঁড় করাতে হবে। চর্চাটা যদি এখান থেকে শুরু করা যায়, তাহলে এগুলোকে কেন্দ্র করে যদি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একধরনের গণতন্ত্রায়ণ হবে, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন হবে, সহনশীলভাবে পরস্পরের সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হবে।

প্রথম আলো:

নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত নিয়ে আপনি নিজে অনেক লিখেছেন, বলেছেন। গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে সেই নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরির ক্ষেত্রে কি কোন অগ্রগতি হলো?

আলী রীয়াজ: নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরি করার জন্য যতটা সময় এবং যে ধরনের পরিস্থিতি প্রয়োজন, সেটা আমরা জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে পাইনি। কিন্তু আকাঙ্খাটা তৈরি হয়েছে, এই ধারণাটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, একটা নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরি করতে হবে। এইটা হচ্ছে অগ্রগতি। কোন নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরি করতে হলে, তার অন্যতম মূল উপাদান হচ্ছে রাজনৈতিক অর্থনীতিটা পরিবর্তন করা, নতুন বন্দোবস্তের পলিটিক্যাল ইকোনমি তৈরি করা। সেটি এত স্বল্প সময়ে করা সম্ভব হয়নি; করা যেত কি না, সেটিও আমি নিশ্চিত নই; কিন্তু আকাক্ষার দিক থেকে যেটি তৈরি হয়েছে, সেটি সহজে চলে যাবে না।

নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরি করা গেল না বলে আমি খুব হতাশ নই। এবার যেহেতু নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরি করা যায়নি, অতএব এটা কোনোদিনই হবে না, আমি সেটিও মনে করি না। মানুষের মধ্যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে; চিন্তাটা তৈরি হয়েছে; রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একধরনের সচেতনতা তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য চেষ্টাটা অব্যাহত থাকবে, এটা আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।

প্রথম আলো:

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি বলেছেন, আগামী নির্বাচনে ঠিক হবে দেশ উদারপন্থী, না উগ্রপন্থী—কাদের হাতে যাবে। আপনি দীর্ঘদিন ধর্মীয় উগ্রপন্থা, সন্ত্রাসবাদ, এগুলো নিয়ে কাজ করেছেন। বাংলাদেশের কি সত্যিই উগ্রপন্থীদের রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে?

আলী রীয়াজ: এটা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাহেবের বক্তব্য বা ওনার দলের বক্তব্য। তাঁর বক্তব্যকে খাটো করার কোনো চেষ্টা আমার নেই। কিন্তু তিনি উগ্রপন্থী বলতে কাদের ইঙ্গিত করছেন, আর উদারপন্থী বলতেই–বা কাদের বোঝাচ্ছেন, এটা তিনিই ব্যাখ্যা করতে পারবেন। এটা না হলে ওটা—যখন কেউ এ রকম বাইনারিতে যান, তখন একধরনের পোলারাইজেশন বা মেরুকরণ তৈরি হয়। সেটি আসলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অগ্রগতির ক্ষেত্রে একটু সমস্যা তৈরি করে। মেরুকরণের জায়গাগুলো আমাদের অ্যাভয়েড করা দরকার।

আমি এবারের নির্বাচনটাকে অন্যভাবে দেখি। নির্বাচন হলে কোন দল ক্ষমতায় যাবে, কেউ কেউ বিরোধী দল হবে; কিন্তু এটিকে কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার নির্বাচন হিসেবে বিবেচনা করলে তা বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য সেটি ইতিবাচক হবে না।

বাংলাদেশের ২০২৬ সালের নির্বাচন হচ্ছে একটি ফাউন্ডেশনাল নির্বাচন, এটি এমন একটি নির্বাচন যার মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতের বাংলাদেশের পথরেখা তৈরি হবে। দেশটি কোন দিকে যাবে? আমরা ইনক্লুসিভ থাকব কি না? রাষ্ট্রের ভূমিকা কী হবে? নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা এই বিষয়গুলো সবাই মিলে ঠিক করব—এবারের নির্বাচনকে আমি সেভাবেই বিবেচনা করতে চাই।

প্রথম আলো:

সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

আলী রীয়াজ: আপনাকেও ধন্যবাদ।