ফারুখ ফয়সল

প্রথম আলো: আপনারা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিরোধিতা করছেন কেন?

ফারুখ ফয়সল: আর্টিকেল নাইনটিন সব মানুষের নিরাপদে মতপ্রকাশের অধিকারের জন্য কাজ করে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ সালে পাস হওয়ার পর থেকেই আমরা মনে করছি আইনটি আমাদের সংগঠনের যে লক্ষ্য, তার পরিপন্থী। আমাদের লন্ডন অফিসের আইন বিভাগ এই আইনের একটি বিশ্লেষণ করে। বিশ্লেষণে দেখানো হয়েছে, এই আইন কী কী ভাবে জনগণের বিশেষ করে সাংবাদিক ও সোশ্যাল কমিউনিকেটরদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে হরণ করবে। ওই বিশ্লেষণে এটিও দেখানো হয়েছে যে এই আইনের কোনো কোনো ধারা আন্তর্জাতিক এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন সনদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আমরা এটি বাংলাদেশ সরকারের আইন মন্ত্রণালয়ে জমা দিই। সে সময় আমাদের এই আপত্তি সরকার মোটেই বিবেচনায় নেয়নি। পরে জাতিসংঘের মাধ্যমে আমরা এটি আবার বাংলাদেশ সরকারের দৃষ্টিগোচর করি। ততক্ষণে পানি অনেক দূর গড়িয়ে গেছে। আইনটির গুরুতর অপব্যবহার হয়েছে এবং সরকারের অন্তত তিনজন মন্ত্রী এই অপব্যবহারের কথা স্বীকার করেছেন। এটা থেকেই এই কথা স্পষ্ট যে বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করতে আমরা এই আইনটির ব্যাপারে আপত্তি করে আসছি, তা যৌক্তিক।  

প্রথম আলো: সরকার তো বলছে, ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য এই আইন করা হয়েছে। সরকারের এই যুক্তি খণ্ডন করবেন কীভাবে?

ফারুখ ফয়সল: এই আইনের নামটিই বিভ্রান্তিকর। একে বলা হচ্ছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কিন্তু এই আইনটি দেশের মানুষকে, সাংবাদিকদের, নারীদের, শিশুদের অনিরাপদ একটি অবস্থানের মধ্যে ফেলে দিচ্ছে (ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ)। আইনটি শুধু মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে হরণ করা এবং দেশে একটি ভয়ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য ব্যবহার করা হয়। ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ যদি এই আইনটি করত, তাহলে যেখানে ডিজিটাল মাধ্যমে প্রতারণা ও অবমাননার ঘটনা ঘটছে সেখানে এই আইনের ব্যবহার দেখি না কেন। জনগণের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। এই আইনের মাধ্যমে সরকার ঠিক তার উল্টো কাজটি করছে।

প্রথম আলো: সরকার বলছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সাংবাদিকদের বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে না। কিন্তু পরিসংখ্যান কী বলে?

ফারুখ ফয়সল: এটা আমরা জোর গলায় বলতে পারি, এই আইন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণের জন্য যত্রতত্র ব্যবহার করা হচ্ছে।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৮ সালে মাত্র দুই মাসে ৩৪টি মামলা হয়েছে। ২০১৯ সালে হয়েছে ৬৩টি মামলা হয়েছে। ২০২০ সালে হয়েছে ১৯৭টি মামলা, এর মধ্যে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হওয়া ৪১টি মামলায় ৭৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয় এবং ৩২ জনকে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ২০২১ সালে মামলা হয়েছে ২৩৮টি। এর মধ্যে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হওয়া মামলার সংখ্যা ৩৫, অভিযুক্ত সাংবাদিক ৭১ জন এবং তাৎক্ষণিকভাবে ১৬ জন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ২০২২ সালে মামলা হয়েছে ১২২টি। এর মধ্যে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হওয়া মামলার সংখ্যা ২৬, অভিযুক্ত সাংবাদিক ৬১ জন এবং তাৎক্ষণিকভাবে ৬ জন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ২০২৩ সালে এসে দেখা যাচ্ছে এই আইনটির অপব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। শুধু জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মামলা হয়েছে ১৬টি এবং ১৬ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে। মার্চ মাসে এসে আইনটি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহাররে ক্ষেত্রে ভয়ংকর রূপ ধারণ করছে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক (সাভারে কর্মরত) শামসুজ্জামান। আদালত তাঁর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠান। ৩০ মার্চ, সিএমএম আদালত, ঢাকা
ছবি: প্রথম আলো

প্রথম আলো: জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের প্রধান ফলকার টুর্ক এই আইনের প্রয়োগ স্থগিত করার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ সরকারের প্রতি। আপনি কি মনে করেন আইনের প্রয়োগ স্থগিত করাই যথেষ্ট? অনেক সংগঠন তো আইনটি পুরোপুরি বাতিল করার কথা বলছেন। এ বিষয়ে আর্টিকেল নাইনটিনের অবস্থান কী?

ফারুখ ফয়সল: জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের প্রধানের এই আহ্বানকে আমরা স্বাগত জানাই। আশা করি, সরকার এই আহ্বান প্রতি সম্মান দেখাবে। এখন এই আইনটি যে অবস্থায় আছে, সেটিকে আমরা কালাকানুন বলে বিবেচনা করি। আইনটির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করা  প্রয়োজন এবং এই আইনটিকে জনগণের ডিজিটাল অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, এমন একটি আইনে রূপান্তর করা প্রয়োজন।

প্রথম আলো: আর্টিকেল নাইনটিন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করে। আপনি দক্ষিণ এশীয় পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অবস্থা ব্যাখ্যা করবেন কী?

ফারুখ ফয়সল: বাংলাদেশ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার আর কোনো দেশে এমন অবস্থা নেই। সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা বাংলাদেশের অবস্থা ক্রমাগত নিচের দিকে নামছে। এটা দুঃখজনক যে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের অবস্থান বাংলাদেশের চেয়ে ভালো। পাকিস্তানের অন্তত দুটি প্রদেশে সাংবাদিক সুরক্ষা আইন রয়েছে। বাংলাদেশেও একটি সাংবাদিক সুরক্ষা আইনের খুবই প্রয়োজন।

প্রথম আলো: একটি খবরের সূত্রে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দিয়ে প্রথম আলোর সাংবাদিক শামসুজ্জামানকে বাসা থেকে রাতে তুলে নিয়েছে সিআইডি। আটকের ৩৫ ঘণ্টা পর তাঁকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। পুরো বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

ফারুখ ফয়সল: শামসুজ্জামানকে যেভাবে ভোররাতে সাদাপোশাকের লোকেরা তুলে নিয়ে গেছে, সেটিকে আমরা অপহরণ বলে বিবেচনা করি। গ্রেপ্তার দেখানোর আগে প্রায় ২০ ঘণ্টা তিনি কোথায় ছিলেন, সেটা জানার অধিকার জনগণের আছে। আমরা উল্লেখ করতে চাই, ফটোসাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজলের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছিল। সাংবাদিক এবং সাধারণ মানুষের এ ধরনের অপহরণকে আমরা সব সময় নিন্দা করি।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে রাজধানীর রমনা থানায় করা মামলায় প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান ছয় সপ্তাহের আগাম জামিন পেয়েছেন। রোববার, ২ এপ্রিল, হাইকোর্ট প্রাঙ্গন, ঢাকা।
ছবি: প্রথম আলো

প্রথম আলো: একই ঘটনায় প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানের বিরুদ্ধেও মামলা করা হয়েছে। একটি মামলায় সম্পাদকের নাম নেই। আরেকটি মামলায় সম্পাদককে জড়ানো হয়েছে। এটা কি হয়রানিমূলক নয়?

ফারুখ ফয়সল: দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানের নামের মামলাটিকে আমরা হয়রানিমূলক মামলা বলে মনে করি। এর আগে ডেইলি স্টার-এর সম্পাদক মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন স্থানে মানহানির মামলা করে তাঁকে হেনস্তা করা হয়েছে। সম্পাদক এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলার এই প্রবণতা বন্ধ করে প্রেস কাউন্সিলকে আরও শক্তিশালী করা দরকার বলে আমরা মনে করি।

প্রথম আলো: আইনমন্ত্রী আনিসুল হক একাধিকবার বলেছেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগ বন্ধে তাঁরা পদক্ষেপ নিচ্ছেন। একজন মানবাধিকারকর্মী হিসেবে আপনি কি কোনো পদক্ষেপ দেখতে পারছেন?

ফারুখ ফয়সল: আইনমন্ত্রীর সঙ্গে আমর ব্যক্তিগত আলাপ হয়েছে। তিনি আমাকে স্পষ্ট বলেছেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন রিভিউ করার জন্য একটি কমিটি করা হয়েছে। তিনি এটাও বলেছেন যে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যাতে আইনটি অপব্যবহার করা না হয়, তা তিনি দেখবেন এবং অপপ্রয়োগ বন্ধে ব্যবস্থা নেবেন। কিন্তু আমি বাস্তবে এর কোনোটিই দেখতে পাই না।

প্রথম আলো: আপনিও একসময় সাংবাদিকতা করতেন। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলুন, আপনাদের সময় সাংবাদিকতার যে চ্যালেঞ্জ ছিল, এখন সেটি আরও বেড়েছে কি না?

ফারুখ ফয়সল: সাংবাদিকতা একটি ঝুঁকিপূর্ণ পেশা। আমরা যখন সাংবাদিকতা করেছি তখনো নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ ছিল। কিন্তু তা এখনকার মতো এত ভয়াবহ ছিল না। এত মামলা, হামলা ছিল না। প্রকাশিত কোনো সংবাদে সরকার বা কোনো ব্যক্তি বা কোনো সংস্থা অসন্তুষ্ট হলে, সংবাদপত্রে প্রতিবাদলিপি পাঠাতেন। সংবাদপত্রের ওই প্রতিবাদলিপি প্রকাশ করার দায়িত্ব ছিল। প্রতিবাদের সঙ্গে সংবাদপত্রের বক্তব্যও ছাপা হতো। আজকে সেই রীতি আর নেই। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার দেশে সাংবাদিকদের মধ্যে একটি ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে এবং সারা বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থানকে খাটো করেছে। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা এবং বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দুটির মানই অনেক নিচে নেমে যাবে।

প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।

ফারুখ ফয়সল: আপনাকেও ধন্যবাদ।