আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কিন্তু আপনি নির্বাচন নিয়ে নানা অনিশ্চয়তা ও আশঙ্কার কথা বলছেন। আপনি কেন এই অনিশ্চয়তা বা আশঙ্কা দেখছেন?
জিল্লুর রহমান: আমি আসলে এখন পর্যন্ত আমার ফ্রেমের মধ্যে কোনো ইলেকশনই দেখি না। আমাকে কেউ প্রশ্ন করতে পারেন যে আপনি কি আইডিয়াল ইলেকশন দেখেন, নাকি একেবারেই নামে মাত্র কোনো ইলেকশন দেখেন; আমি নামে মাত্র ইলেকশনটাও দেখি না। আমি মনে করি যে ১২ তারিখ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়াই সবার জন্য খুব কঠিন হবে। আর যদি ইলেকশন হয়ও, সেটা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি খারাপ নির্বাচনের নজির হয়ে থাকবে এবং ভোটের দিনেই নির্বাচনটি আনম্যানেজেবল হয়ে যেতে পারে।
আমার ধারণা, সরকার আসলে গণভোটটাই করতে চায়। জাতীয় সংসদ নির্বাচন করার জন্য যে ধরনের প্রস্তুতি থাকা দরকার, নেওয়া দরকার, সেটা একেবারেই নেওয়া হয়েছে বলে আমার কাছে মনে হয়নি। আমি গত কয়েক দিনে দেশের বেশ কয়েকটি জেলা ঘুরেছি, নির্বাচনী আমেজ বলতে যা বোঝায় তা তেমন দেখা যায়নি। অনেকে বলতে পারেন যে এবার প্রচারণার ক্ষেত্রে আরপিওতে অনেক বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে, সেই কারণে হয়তো নির্বাচনী পরিবেশ বোঝা যায় না। কিন্তু বাস্তবে আমি যেটা দেখেছি, সেটা শুধু গণভোটের সরকারি প্রচারণা।
সরকারসংশ্লিষ্ট বা সরকারের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক পক্ষগুলোর দাবি ছিল আগে গণভোট হোক, পরে জাতীয় সংসদ নির্বাচন; হয়তো সরকার সে রকম চাইছে। কিন্তু এটাও সম্ভব হবে বলে আমার মনে হয় না। আর নির্বাচন যদি শেষ পর্যন্ত করাও যায়, সেটা একটা ওয়েল ইঞ্জিনিয়ারড ইলেকশন হবে। এমন একটা ধোঁয়াটে পরিবেশের মধ্যে ইলেকশনটা হবে যে কারও পক্ষেই বোঝা সম্ভব হবে না, কোথা থেকে কী হচ্ছে এবং ফলাফলটা হতে পারে খুবই সারপ্রাইজিং। সারপ্রাইজিং এই অর্থে, সাধারণভাবে যে দলটি জয়ী হবে বলে পারসেপশন তৈরি হয়েছে, তারা নাও জিততে পারে।
নির্বাচন নিয়ে আপনি যে অনিশ্চয়তা বা আশঙ্কার কথা বলছেন, সেটার কি বাস্তব কোনো কারণ আছে? কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য বা কোনো ধরনের রাজনৈতিক ইঙ্গিত আছে?
জিল্লুর রহমান: এটা তথ্য-উপাত্তের বিষয় নয়; আমি যেহেতু রাজনীতি নিয়ে কাজ করি, সারাক্ষণই রাজনীতির মধ্যেই থাকি এবং দেশি-বিদেশি নানা মহলের সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়-সব মিলিয়ে এটা আমার বোঝাপড়া বা বিশ্লেষণ। আমার কাছে মনে হয়েছে, ক্ষমতার স্টেকহোল্ডাররা খুবই অ্যাগ্রেসিভ এবং অন্তর্বর্তী সরকার একেবারেই আন্তরিক নয়; সরকার যে নির্বাচন চায়, সেটা তার দৈনন্দিন কার্যাবলি দেখলে মনে হবে না। এই সরকার নতুন নতুন প্রকল্প, নতুন নতুন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে, যেগুলো তার এখন করার কথাই নয়।
দ্বিতীয়ত, অন্তর্বর্তী সরকার খুব স্পষ্টভাবেই কোনো কোনো রাজনৈতিক শক্তির পক্ষ নিয়ে কাজ করছে। সরকারের ভেতরে একটা বড় শক্তি আছে, যারা নির্বাচনটাই চায় না, চাইলেও তারা পক্ষপাতমূলক নির্বাচন করতে চায়। সরকারের বাইরে একটা উগ্র গোষ্ঠী তৈরি করা হয়েছে এবং তারা আসলে সরকারের সঙ্গেই কাজ করে। দেশের বাইরেও একটা শক্তি তাদের হয়ে কাজ করছে।
আরেকটা হচ্ছে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর তৎপরতা। আমার কাছে মনে হয়েছে যে বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনো কোনো নির্বাচনকে সামনে রেখে এতগুলো দেশ একসঙ্গে এত বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠেনি; সেটা আমাদের এই অঞ্চলের শক্তিগুলোর কথা বলি আর বৈশ্বিক পরিমণ্ডলের কথাই বলি। অনেক কথা এখন বাতাসে ভেসে বেড়ায়, অনেক কথা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আসে; একেকজনের একেক রকমের চাওয়া-আকাঙ্ক্ষা। এসব কিছু বিবেচনায় নিয়েই নির্বাচনের ব্যাপারে আমি আমার কথা বলেছি।
এবার যে নির্বাচনটা হওয়ার কথা, সেটাকে কি অন্তর্ভুক্তিমূলক বা অংশগ্রহণমূলক বলা যাবে?
জিল্লুর রহমান: এ নির্বাচনকে কোনোভাবেই অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন বলা যাবে না। কারণ, আওয়ামী লীগ এবং তার মিত্রদের একটা বড় অংশ নির্বাচনে অনুপস্থিত। এদের বাদ দিয়ে নির্বাচন কীভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে? আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে বাকিরা যদি একটা ভালো নির্বাচন করতে পারত, তাহলেও কথা ছিল। তখন নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হলেও, এতটা হতো না। কিন্তু আওয়ামী লীগ বাইরে এবং এ রকম একটা খারাপ নির্বাচন হবে, সেটাকে আসলে শেষ পর্যন্ত কেউই আর অ্যাকসেপ্ট করতে চাইবে বলে আমার কাছে মনে হয় না।
আরেকটা বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, অর্থাৎ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, আদিবাসী এবং লৈঙ্গিক বৈচিত্র্যের যাঁরা-আমি তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার বোধ রয়েছে। তাঁরা মনে করছেন, ভোট দিতে গেলেও তাঁর বিপদ, না গেলেও বিপদ। তাই এবারের নির্বাচনে তাঁদের অংশগ্রহণও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য অনুকূল আছে বলে মনে করেন?
জিল্লুর রহমান: একদমই না। পুলিশ একদমই অ্যাকটিভ না। অনেক দিন ধরে মাঠে থাকায় সেনাবাহিনীও ক্লান্ত। তা ছাড়া তাদের যেভাবে সমালোচনা ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হয়েছে, তাদের মোরাল স্ট্রেন্থও দুর্বল হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য একেবারেই অনুকূলে নেই।
আপনি কি মনে করেন অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতার প্রশ্নে আস্থার ঘাটতিতে ভুগছে?
জিল্লুর রহমান: এই সরকারকে এক মুহূর্তের জন্য আমার কাছে নিরপেক্ষ বলে মনে হয়নি। এনসিপি নামে যে দলটি গঠিত হয়েছে, সেটা এই সরকারের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে তৈরি হয়েছে। আমি বলব, অন্তর্বর্তী সরকার এই তরুণদের ব্যবহার করেছে এবং তাদের সম্ভাবনাকে ধ্বংস করেছে। এই সরকারকে আমার কাছে অনেক বেশি জামায়াতে ইসলামীর দ্বারা প্রভাবিত বলে মনে হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ তো নয়ই, বরং সরকারে থাকা অনেকেই, এমনকি সরকারপ্রধানও বিভিন্ন সময় প্রতিহিংসা ও ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রাগ-অনুরাগের ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করার যে শপথ তাঁরা নিয়েছিলেন, সেই শপথ তাঁরা রক্ষা করতে পেরেছেন বলে আমার মনে হয় না। তাঁরা যেভাবে নিজেদের জন্য সরকারি বা রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধাগুলো নিয়েছেন, তাঁদের কাছ থেকে আমরা তা আশা করিনি।
প্রশাসন, পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী? তারা কি সত্যিকার অর্থে নির্বাচনে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের জন্য প্রস্তুত?
জিল্লুর রহমান: আমার কাছে মনে হয় যে পুলিশ নিষ্ক্রিয়, সেনাবাহিনী নির্লিপ্ত এবং প্রশাসন বিভ্রান্ত। প্রশাসন বা আমলাতন্ত্রকে সরকারের নির্দেশ শুনতে হয়; কিন্তু প্রশাসনের ওপর এ সরকারের খুব বেশি নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে আমার মনে হয় না। তবে গত ১৭-১৮ মাসে প্রশাসনসহ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় জামায়াতে ইসলামী যথেষ্ট প্রভাব তৈরি করতে পেরেছে; বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসের জামায়াত এবার সবচেয়ে অনুকূল পরিবেশ পেয়েছে।
আচ্ছা, রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক আস্থার সংকট কি নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে?
জিল্লুর রহমান: রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থার সংকট তো তৈরি হয়েছেই; এনসিপি যখন তৈরি হলো, এনসিপির তরুণ নেতাদের কথাবার্তা, আচার-আচরণে মনে হয়েছে, তারা আওয়ামী লীগকে বিতাড়িত করেছে, এখন বিএনপিকে বিতাড়িত করতে চায়। বিএনপির নেতৃত্ব সম্পর্কে তারা খুবই বাজে ভাষায় কথাবার্তা বলেছে।
দ্বিতীয়ত, তেল আর জল তো একত্রে মেশার কথা নয়। জামায়াত একসময় বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছে, এর আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন করেছে। এরপরও এই দলগুলোকে এক কাতারে ফেলা যাবে না; মুক্তিযুদ্ধ আর মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তিকে তো এক পাল্লায় বিবেচনা করা না।
তৃতীয়ত, যে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি, মধ্যপন্থার রাজনীতির কথা আলোচিত হয়েছে, তার সঙ্গে উগ্রপন্থা বা চরম ডানপন্থাকে মেলানো যাবে না। তাই এখানে পারস্পরিক আস্থা বা ঐক্যের কিছু নেই। মধ্যপন্থার রাজনীতি বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যে রাজনীতি, সেটাকে ধারণ করা, এগিয়ে নেওয়ার সেই জায়গাটাতে এই বৈরিতাটা খুব স্বাভাবিক এবং এই বৈরিতাটা থাকবেই।
বিএনপির সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য জামায়াত কিছুটা চেষ্টা করেছিল। জামায়াত জাতীয় সরকারের একটা টোপ দিয়েছিল বিএনপিকে। বিএনপি চাইলে সেটা হয়তো হয়েও যেত। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিরোধী দল না থাকলে, সেটা ভালো কিছু হবে না। তা ছাড়া জামায়াতের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হলে বিএনপির যে রাজনীতি, সেটা হুমকির মুখে পড়বে।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থার সংকট কাটাতে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত ছিল বলে আপনি মনে করেন?
জিল্লুর রহমান: সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করার যে চেষ্টা, এই সরকারের মধ্যে আমি কখনোই সেটা দেখিনি। ঐকমত্য কমিশন আট-নয় মাস ধরে যে আলোচনা করল, সেখানে ৫০-এর বেশি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে থেকে ৩০-৩২টি দল অংশ নিতে পেরেছে। বাকি দলগুলোকে তারা বাইরে রেখেছে বা যুক্ত করার চেষ্টা করেনি। এক্সিকিউটিভ অর্ডারে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম সাসপেন্ডেড, কিন্তু বাকি দলগুলোকে কেন ইনভাইট করা হলো না? তাদের এই আলোচনায় নারীদের প্রতিনিধিত্ব, মাইনরিটি কমিউনিটির প্রতিনিধিত্ব কি দেখা গেছে? তাদের সঙ্গে কি আলাদাভাবে কথা বলা হয়েছে? না, সেটাও হয়নি।
সরকার নিজে নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশে বড় দল চারটি-বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি এবং ইসলামী আন্দোলন। প্রধান উপদেষ্টাসহ সরকারের উপদেষ্টারা বিভিন্ন সময়ে এই চারটি দলের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। কোন বিবেচনায়, কীভাবে এই সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হলো? কীভাবে বিবেচনা হলো যে এই চারটিই বড় দল?
এই সিদ্ধান্তগুলো সরকার নিজের মর্জিমতো নিয়েছে। তার মানে আস্থার সংকট কাটানোর ক্ষেত্রে এই সরকারের আসলে তেমন কোনো ভূমিকা নেই। আমার কাছে বরং মনে হয়েছে যে আস্থার সংকটটা থাকলেই সরকারের সুবিধা। এটা তারা জিইয়ে রাখতে চাইছে। অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনূস দক্ষিণ আফ্রিকার মতো বাংলাদেশের নেলসন ম্যান্ডেলা হতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেই দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারেননি বা সে রকমভাবে কাজ করেননি।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরদারি ও চাপ নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় কতটা প্রভাব ফেলতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
জিল্লুর রহমান: গত কয়েক বছরে বাংলাদেশকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহল এবং অন্য দেশগুলোর অনেক রকমের স্বার্থ তৈরি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সবার দৃষ্টিভঙ্গি একই রকম নয়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরস্পরবিরোধী পক্ষগুলো হয়তো একই রকমভাবে চিন্তা করছে। তবে অন্য দেশগুলোতে যা কিছু করা সম্ভব, বাংলাদেশে সেটা করা একটু ডিফিকাল্ট।
পেশাগত কারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আমার যথেষ্ট ইন্টারঅ্যাকশন করার সুযোগ হয়। আমি একটা বিষয় না বলে পারছি না, বাংলাদেশের গ্রাউন্ড রিয়্যালিটি সম্পর্কে তাঁদের অনেকেরই খুব ভালো বোঝাপড়া নেই। তাঁরা নির্বাচনও চাইছেন, আবার স্থিতিশীলতাও চাইছেন। সামনের দিনগুলো অস্থিতিশীল হয়ে উঠলে তাঁরা কী চাইবেন, বা কী বলবেন, সেটা আমি নিশ্চিত নই।
সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
জিল্লুর রহমান: আপনাকেও ধন্যবাদ।